দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষার ফলাফল অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। এর ফলে চুল্লির পরবর্তী পর্যায়ের কমিশনিং কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তা কার্যক্রম সম্পন্ন হলে আগামী মাসে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা ছিল গত সেপ্টেম্বরে। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় নির্ধারিত সময়সূচিতে পরিবর্তন আনতে হয়। পরে উচ্চ চাপে দুই দফা পরীক্ষা চালিয়ে ফলাফল নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার পরীক্ষার ফলাফল অনুমোদন করা হয়েছে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ অনুমোদনের ফলে প্রথম ইউনিটের চুল্লি চালুর প্রস্তুতিতে নতুন অগ্রগতি এসেছে। তবে পরীক্ষার ফলাফল অনুমোদন পেলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়ে যায় না। চুল্লির নিরাপত্তা, কারিগরি কার্যকারিতা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে ধাপে ধাপে পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।
পরবর্তী ধাপে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ও স্বনির্ভর পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে। এরপর ধীরে ধীরে চুল্লির তাপ উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে টারবাইন চালু ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরীক্ষামূলক উৎপাদন থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে আরও সময় প্রয়োজন হবে। সংশ্লিষ্ট সব পরীক্ষা ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের ফলাফলের ওপর পরবর্তী সময়সূচি নির্ভর করবে।
রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। কেন্দ্রটির প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করতে পারবে। এতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কেন্দ্রটির প্রকৃত অবদান নির্ভর করবে উৎপাদনক্ষমতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ধারাবাহিকতার ওপর।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পারমাণবিক শক্তি উইংয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, রূপপুর শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নয়; এটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের বড় সুযোগ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম ইউনিট উৎপাদনের প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়ামও প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে।
একই উইংয়ের অতিরিক্ত সচিবের মতে, কেন্দ্রটি চালু হলে জাতীয় গ্রিড শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে রূপপুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। প্রয়োজনীয় সংস্কার, কারিগরি মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে এর কার্যকাল আরও ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তবে দীর্ঘ মেয়াদে কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং নির্দিষ্ট সময় পর পারমাণবিক জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ধারণা স্বাধীনতার পরপরই আলোচনায় আসে। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় রাশিয়ার সহায়তায় বর্তমান প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করে।
এখন প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর অপেক্ষা। নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষার ফলাফল অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সেই প্রস্তুতিতে অগ্রগতি হলেও চূড়ান্তভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করতে হবে।
সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা। তবে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু, নিরাপদ পরিচালনা এবং ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করাই হবে প্রকল্পটির সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।












