যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হাম বা মিজলসের (Measles) সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে দেশটিতে হাজার হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। কম টিকাদান, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে একের পর এক গুচ্ছ সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রে হামে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজারে পৌঁছেছে। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় শিশু ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এমএমআর টিকার কভারেজ কম, সেসব এলাকায় সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি।
পরিস্থিতির অবনতির কারণে গত ৫ অক্টোবর নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোচুল পুরো অঙ্গরাজ্যে জরুরি স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘোষণা করেন। গভর্নরের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, ৩ অক্টোবর পর্যন্ত নিউইয়র্কে ১০৮ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জুলাইয়ের পরই আক্রান্ত হয়েছেন ৯২ জন—অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যে সংক্রমণের বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা গেছে।
নিউইয়র্কের পাশাপাশি পেনসিলভেনিয়াতেও হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রাজ্যের ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর হামে আক্রান্ত হয়ে পঞ্চম ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
চলতি বছর পেনসিলভেনিয়ার ৩৯টি কাউন্টিতে এক হাজারের বেশি মানুষের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। তবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে মৃত্যুর খবর এলেও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বা সিডিসির ওয়েবসাইটে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে দুই মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ভৌগোলিক পরিধিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একটি এলাকায় কয়েকজন আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত পরিবারের সদস্য, স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও স্থানীয় কমিউনিটির অন্যদের মধ্যেও এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যে সমান মাত্রায় হাম ছড়াচ্ছে না। তবে কম টিকাদানের হার থাকা এলাকাগুলোতে বড় বড় সংক্রমণ গুচ্ছ বা ‘আউটব্রেক’ তৈরি হচ্ছে।
সিডিসির হিসাবে, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ৪২টি বড় ধরনের হাম-সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এসব আউটব্রেকের সঙ্গে মোট আক্রান্তের প্রায় ৯৫ শতাংশই সম্পর্কিত। পেনসিলভেনিয়া, সাউথ ক্যারোলাইনা ও ইউটাহ—এই তিন অঙ্গরাজ্যে ইতোমধ্যে ৫০০-এর বেশি করে আক্রান্তের তথ্য পাওয়া গেছে।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং যেখানে টিকাদানের হার কম, সেখানেই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। কোনো একটি এলাকায় ভাইরাস প্রবেশ করার পর পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষ টিকাপ্রাপ্ত না থাকলে সংক্রমণের শৃঙ্খল থামানো কঠিন হয়ে পড়ে।
হামের সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গা হলো এর সংক্রমণক্ষমতা। কোনো ব্যক্তি টিকা না নিয়ে থাকলে এবং হামে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে তাঁর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা টিকাবিহীন ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি পরিস্থিতিভেদে সর্বোচ্চ ১৮ জন পর্যন্ত সংবেদনশীল মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন।
হামের রিপ্রোডাকশন নম্বর বা R₀ প্রায় ১৮ ধরা হয়। অর্থাৎ একটি জনগোষ্ঠীতে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ না থাকলে একজন আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণেই হামকে বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে হাম সংক্রমণ বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো টিকাদানের হার কমে যাওয়া। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ টিকাদানের কারণে হাম নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কোনো জনগোষ্ঠীতে টিকাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে সেখানে ভাইরাসের দ্রুত বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়।
এখানে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামাজিক প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি জনগোষ্ঠীর বড় অংশ টিকাপ্রাপ্ত থাকলে আক্রান্ত ব্যক্তি থাকলেও ভাইরাসের পরবর্তী মানুষের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কমে যায়। ফলে সংক্রমণের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়।
কিন্তু টিকাদানের হার কমে গেলে এই সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশ্বের অন্য কোনো অঞ্চল থেকে আক্রান্ত ব্যক্তি বা ভ্রমণকারীর মাধ্যমে হাম ভাইরাস নতুন কোনো এলাকায় প্রবেশ করলে সেখানে অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটি কমিউনিটির প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকাপ্রাপ্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এই মাত্রার টিকাদান কভারেজ থাকলে ভাইরাসের অবাধ বিস্তার ঠেকাতে সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের তথ্য পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক তুলে ধরেছে। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ১৮টি অঙ্গরাজ্যে এমএমআর টিকার কভারেজ ৯০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। ফলে এসব এলাকায় হাম ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।
বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মধ্যে টিকার কভারেজ কমে গেলে একটি আক্রান্ত শিশুর মাধ্যমে একই শ্রেণিকক্ষ, স্কুল বা পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথের কমিশনার ডা. জেমস ম্যাকডোনাল্ড জানিয়েছেন, হাম, মাম্পস ও রুবেলা থেকে সুরক্ষার জন্য এমএমআর টিকাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। নির্ধারিত ডোজ গ্রহণ করলে হাম থেকে সুরক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; সংক্রমণের শৃঙ্খল থামাতে টিকাদানের হার বাড়ানো, আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত ও প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক রাখা এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রে চলমান সংক্রমণ তাই শুধু একটি অঙ্গরাজ্য বা নির্দিষ্ট একটি কমিউনিটির সমস্যা নয়। টিকাদানের হার কমতে থাকলে অতীতে নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম আবারও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে। শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহসহ গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে সক্ষম এই রোগের বিস্তার ঠেকাতে উচ্চ টিকাদান কভারেজ বজায় রাখাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।










