আলোচনার জন্য উপযুক্ত ইরানি নেতা খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে ওয়াশিংটন, দাবি মার্কিন প্রেসিডেন্টের; ইরানের বিমানবাহিনী ও ১৫৯টি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসের দাবিও পুনর্ব্যক্ত
চলমান যুদ্ধ-সংঘাতে ইরানের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ‘বাড়াবাড়ি’ করে ফেলেছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ইরানের নেতৃত্বকে দুর্বল করার পর এখন ওয়াশিংটন বুঝতে পারছে না, আলোচনার জন্য দেশটির কোন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। এমনকি ইরানের ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে যাদের কথা যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল, তাদের কেউই ওই দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছেন না বলেও দাবি করেছেন তিনি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ইয়ংস্টাউন শহরে রিপাবলিকান পার্টির একটি নির্বাচনী প্রচারণা সমাবেশে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় এসব কথা বলেন ট্রাম্প। প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি সংলাপ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন, ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে ওয়াশিংটনের হিসাব-নিকাশ এখন জটিল হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে সম্ভবত আমরা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। এখন আমরা বুঝতেই পারছি না যে (ইরানে) কাদের সঙ্গে আমরা কাজ-কারবার করছি। কেউ ইরানের প্রেসিডেন্ট হতে চায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সত্যি বলতে, কাদের সঙ্গে আলোচনা করব, তা ঠিক করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। আমার মনে হয়, আমরা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি।’
ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তৈরি হওয়া জটিলতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাঁর দাবি, ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে কারা আসতে পারেন, সে বিষয়ে ওয়াশিংটনের যে ধারণা ছিল, বাস্তব পরিস্থিতি তার সঙ্গে মিলছে না।
ইরানের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, কোনো দেশের নেতৃত্বকে দুর্বল করার সামরিক বা রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণের পর সেই দেশের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার জন্য গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধি খুঁজে পাওয়া একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যাদের বিবেচনায় রেখেছিল, তাদের কেউই দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন। তবে তিনি কাদের কথা বলছেন, ওই ব্যক্তিরা কেন দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছেন না কিংবা ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর দাবির পক্ষে কী তথ্য রয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
এ কারণে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ইরানের নেতৃত্বের প্রকৃত অবস্থার নিশ্চিত চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে ইরানের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে মন্তব্যের পাশাপাশি দেশটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, গত প্রায় আট মাসের যুদ্ধে ইরান তার বিমানবাহিনী হারিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির নৌবাহিনীর ১৫৯টি জাহাজও ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের যুদ্ধবিমান এবং যুদ্ধজাহাজগুলো এখন সমুদ্রের তলদেশে সুন্দরভাবে পড়ে আছে।’
তবে ট্রাম্পের এসব দাবির পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদন তৈরির জন্য দেওয়া তথ্যের মধ্যে নেই। ফলে ইরানের বিমানবাহিনীর সম্পূর্ণ ধ্বংস কিংবা দেশটির নৌবাহিনীর ১৫৯টি জাহাজ হারানোর বিষয়টি মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
যুদ্ধের প্রকৃত পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য উভয় পক্ষের বক্তব্য, সামরিক ক্ষয়ক্ষতির নির্ভরযোগ্য হিসাব এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের তথ্য প্রয়োজন। সামরিক অভিযানের বিষয়ে কোনো পক্ষের দেওয়া বক্তব্য সব সময় সম্পূর্ণ পরিস্থিতি তুলে ধরে না।
এদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এবং পারস্য ও ওমান উপসাগর ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ব্রিটিশ সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্সের (ইউকেএমটিও) তথ্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর এলাকায় কমপক্ষে ১৯টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এসব হামলার ফলে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ব্যয়েও প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এসব হামলার প্রতিটি ঘটনার দায় কার, কী ধরনের জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে এবং কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রয়োজন।
ট্রাম্পের বক্তব্যে একদিকে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি, অন্যদিকে দেশটির সঙ্গে আলোচনার জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব খুঁজে পেতে অসুবিধার কথা উঠে এসেছে। এই দুই বক্তব্যের মধ্যে যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য অর্জন এবং রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জটি স্পষ্ট।
যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলে উভয় পক্ষের গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধি নির্ধারণ, আলোচনার শর্ত ঠিক করা এবং সম্ভাব্য সমঝোতা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক কৌশল এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা বাস্তবে কোন পর্যায়ে রয়েছে, আনুষ্ঠানিক বৈঠকের সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে কি না কিংবা দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ চলছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও তথ্য প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে ট্রাম্পের ‘বাড়াবাড়ি’ মন্তব্য যুদ্ধের সামরিক ও কূটনৈতিক পরিণতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সংঘাতের প্রকৃত অবস্থা, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।
সূত্র: দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, আলজাজিরা।












