শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুই দেশের প্রতিনিধিরা এতে সই করেন।
বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আন্ডার সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গ সমঝোতায় সই করেন। বিষয়টি প্রথমে বিএনপি মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসে। পরে রেহান আসাদও চুক্তি সইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
সমঝোতার আওতায় শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা, আইএইএ’র সেফগার্ডস এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার বিষয়ে দুই দেশ তাদের অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছে।
সমঝোতায় জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। দুই দেশই নিজেদের জ্বালানি চাহিদা পূরণে পারমাণবিক শক্তির সম্ভাব্য ভূমিকার কথা স্বীকার করেছে। ফলে ভবিষ্যতে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, গবেষণা, নিরাপত্তা এবং জ্বালানি খাতে পারস্পরিক জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময়ের সুযোগ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা পূরণে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে আগ্রহী। রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অন্যান্য শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিয়েও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
চিকিৎসা, কৃষি, খাদ্য সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও শিল্প খাতেও পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার করা যায়। নতুন সমঝোতা এসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার ইতিহাসও কয়েক দশকের পুরোনো। দুই দেশ ১৯৮১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক ব্যবহারের বিষয়ে একটি চুক্তি সই করেছিল। পরবর্তী সময়ে সেই সহযোগিতা আর নবায়ন হয়নি। নতুন সমঝোতা দীর্ঘ বিরতির পর দুই দেশের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতাকে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে বর্তমান সমঝোতা স্মারককে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি বা নির্দিষ্ট পারমাণবিক জ্বালানি ও প্রযুক্তি সরবরাহের চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্দিষ্ট পারমাণবিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তি বা জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে আলাদা আইনি, কারিগরি ও নিরাপত্তা প্রক্রিয়া প্রয়োজন হতে পারে।
এর আগে গত আগস্টে বাংলাদেশে সফররত মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের পক্ষ থেকে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তখন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ধরনের সম্পৃক্ততাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।
নতুন সমঝোতার ফলে পারমাণবিক নিরাপত্তা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তবে এর বাস্তব প্রয়োগে পারমাণবিক নিরাপত্তা, পরিবেশগত সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।












