দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতার একটি বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এটি বাস্তবায়ন করবে বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
বুধবার (৭ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সভায় মোট ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য তোলা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ১০টি নতুন, দুটি সংশোধিত এবং একটি মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প রয়েছে।
রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে প্রায় ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অর্থায়নের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৯ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য রামপালে আগে অধিগ্রহণ করা জমির একটি অংশে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হবে। ওই এলাকায় ইতোমধ্যে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানির মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট এলাকায় জমি উন্নয়ন ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজও সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে ন্যূনতম ৬৪০ ওয়াট পিক ক্ষমতার সৌর প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি ৩৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত ইনভার্টার এবং একটি পুলিং সাবস্টেশন নির্মাণ করা হবে।
উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাবল সার্কিট ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে উপকেন্দ্রে দুটি ২৩০ কেভি বে স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ডরমিটরি, রেস্টহাউস, মসজিদ এবং তিনতলা নিয়ন্ত্রণ ভবন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশীয় পরামর্শক নিয়োগের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সরকারের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে এটি ভূমিকা রাখতে পারে। ৪৪২ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতার প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হবে।
একনেক সভায় বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়াতে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রকল্পও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘রেলওয়ের সক্ষমতা সম্প্রসারণ প্রকল্প’ নামে এ উদ্যোগে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির জন্য সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৮১১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক থেকে প্রকল্প ঋণ হিসেবে ১ হাজার ৯৫৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, একটি লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল প্রায় ২০ বছর। বাংলাদেশ রেলওয়ের ১১৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ ইতোমধ্যে সেই আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজ বিলম্বিত হওয়ায় মিটারগেজ লোকোমোটিভের প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়েছে। এ কারণে নতুন ৩০টি লোকোমোটিভের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
একনেকের আলোচ্যসূচিতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক ও ড্রেনেজ উন্নয়ন, রংপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনর্বাসন এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৮ নম্বর জোনে সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণের প্রকল্প রয়েছে।
এ ছাড়া সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির উদ্যোগ এবং সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পও রয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিআইডব্লিউটিসির জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও আটটি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীও আলোচনায় রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফ্রান্সের প্যারিসে ক্রয় করা চ্যান্সারি ভবন ব্যবহারোপযোগী করতে সংস্কার ও আধুনিকায়নের প্রকল্প এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পও একনেকের কার্যতালিকায় রয়েছে।
এর মধ্যে ভজনপুর-আটোরখাড়ি-ময়নাগুড়ি-আমতলী-মিরগড়-পঞ্চগড় সড়কের ১৫তম কিলোমিটারে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণ এবং থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ১৩টি প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ, রেল, সড়ক, নগর অবকাঠামো ও নৌপরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে।










