জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং দেশে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন ও নতুন তিন থেকে চারটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। এসব প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে কর ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: বাংলাদেশে বিনিয়োগের চালিকাশক্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী।
সভায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ, শিল্প উৎপাদন সচল রাখা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো জরুরি। এ লক্ষ্য সামনে রেখে স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে নতুন কূপ খনন এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, চুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধান কার্যক্রমের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ১৫০টি কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসের মজুত অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে সরকার।
দেশে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় আমদানিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ জন্য নতুন তিন থেকে চারটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজি সংরক্ষণ করে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করা এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত এসব প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী। তবে প্রকল্পগুলোর চূড়ান্ত বিনিয়োগ কাঠামো, ব্যয় ও বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তিনি উল্লেখ করেননি।
নতুন টার্মিনাল নির্মাণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন ও বড় জাহাজ থেকে জ্বালানি খালাসের সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। অর্থমন্ত্রী বলেন, মাতারবাড়ীর পাশাপাশি খুলনার কাছেও ২০ মিটার ড্রাফটের একটি নতুন স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল ও এলএনজি খালাসের সুবিধাসম্পন্ন আধুনিক টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে জ্বালানি আমদানি, খালাস ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে।
জ্বালানি খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার কার্যক্রম এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গ্যাস ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে পূর্ণাঙ্গ কর ছাড় ও প্রণোদনা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বাসাবাড়ি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনে মানুষকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাড়ি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব। পাশাপাশি উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নির্ধারিত ব্যবস্থার আওতায় স্বাভাবিক দরের চেয়ে বেশি দামে কিনে নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়বে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটবে বলে আশা করছে সরকার।
সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো গেলে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিদ্যুৎ কেনার কার্যকর ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনা সভায় অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, আগের সরকারের আমল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা এবং বিদেশে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে। এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
অর্থমন্ত্রী জানান, রাজস্ব প্রশাসন পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নীতি প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়ন—এই দুই ভাগে বিভক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, এর ফলে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত কমানো এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারে সংস্কারের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ ও স্বচ্ছ নীতিমালা নিশ্চিত করা গেলে দেশে নতুন বিনিয়োগ আসার সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছে সরকার।
বাংলাদেশে জ্বালানির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম, বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা, দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি এবং অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অন্যদিকে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান সফল হলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটলেও বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা, সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ফলে জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বিত উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এফআইসিসিআই আয়োজিত আলোচনা সভায় প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য মোহাম্মদ তামিম, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক।
সভায় জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৫০টি কূপ খনন, নতুন তিন থেকে চারটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রণোদনা কার্যকর করা গেলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, বিনিয়োগের নিশ্চয়তা, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ ভোক্তা ও শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর।