দেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণ ও নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি বিমান কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এ তথ্য জানিয়েছেন।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলের লবিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এর আওতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি করেছে।
চুক্তি অনুষ্ঠানে মার্কিন সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লান্ডাউ, আন্ডার সেক্রেটারি অব কমার্স উইলিয়াম কিমিট এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর।
মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের এভিয়েশন খাত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সে কারণে নতুন উড়োজাহাজের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ প্রয়োজন ও চাহিদা বিবেচনা করেই উড়োজাহাজ কিনবে। বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সঙ্গেও আলোচনা হতে পারে। বোয়িংয়ের একটি প্রতিনিধিদল পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে।
এদিকে, অতিরিক্ত ১১টি উড়োজাহাজ কেনার এই পরিকল্পনা আগের ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির বাইরে। গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তির আওতায় ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। নতুন ১১টি যুক্ত হলে বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিমানের পরিকল্পিত উড়োজাহাজ সংগ্রহের সংখ্যা দাঁড়াবে ২৫টিতে। তবে নতুন ১১টি উড়োজাহাজের মডেল, মোট মূল্য, অর্থায়নের শর্ত ও সরবরাহের সময়সূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বোয়িংকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিকভাবে ইতিবাচক একটি অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের দ্বিতীয় দিনের বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, ওই দিন স্বাস্থ্য, কৃষি, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে বৈঠকে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ, কৃষকদের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও জাতিসংঘের সাইডলাইনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। মিয়ানমারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। তাঁদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসায় বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি জানান, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অভিবাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে বলে জানান তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। প্রয়োজনে বন্ধুত্বপূর্ণ ও নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সংলাপের সুযোগ তৈরিতে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে পারে। সংঘাতের কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং বাংলাদেশি প্রবাসীদের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, সেটিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন বলে জানান মাহদী আমিন। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা, নদী-খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন ও ভারতের ভূমিকা প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উভয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দেশ ও অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দেশটির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, কূটনীতিতে সব দরজা ও সব বিকল্প খোলা রাখতে হয় এবং আলোচনার পথ কখনো বন্ধ করা যায় না।
প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের জাতিসংঘ সফরের আরও দুই দিনের কর্মসূচি রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, পরদিন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলায় বক্তব্য দেবেন।












