আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির বিদায়ী ম্যাচ রাঙিয়ে রাখল আর্জেন্টিনা। উৎসবে পরিণত হওয়া ম্যাচে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে লাতিন আমেরিকার চ্যাম্পিয়নরা। জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের শেষ ম্যাচে গোল করে বিদায় নিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তবে বিদায়ের মুহূর্তেও মেসির কণ্ঠে ছিল গভীর আক্ষেপ—সুযোগ থাকলে তিনি নাকি সারা জীবন আর্জেন্টিনার হয়ে খেলে যেতে চাইতেন।
বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোরে বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করেন মেসি। নিকো পাহ ও নিকোলাস ওতামেন্দির গোলেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। ম্যাচের ফলাফলের চেয়ে এদিন বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মেসির বিদায়।
ম্যাচ ঘিরে সকাল থেকেই মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে ছিল উৎসবের আবহ। ভক্তদের জন্য অনেক আগেই খুলে দেওয়া হয় স্টেডিয়ামের গেট। ম্যাচ শুরুর আগে একে একে মঞ্চ মাতান তারকা শিল্পীরা। পুরো আয়োজনজুড়েই ছিল মেসিকে ঘিরে আবেগ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
ম্যাচের আগেও একাধিকবার আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায় মেসিকে। ম্যাচ শেষে বেনিন ও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা একে একে তাকে আলিঙ্গন করেন। এরপর শুরু হয় বিশেষ ড্রোন শো। আকাশে ফুটে ওঠে মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি, বল পায়ে তার ছুটে চলা এবং ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের উদযাপনের বিভিন্ন দৃশ্য।
এরপর আবারও শুরু হয় গান। এ সময় মেসির পাশে ছিলেন তার স্ত্রী ও তিন ছেলে। কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন জাতীয় দলের সতীর্থরাও।
গান শেষে মঞ্চে ওঠেন মেসি। জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো সমর্থকদের উদ্দেশে কথা বলেন তিনি। তার বক্তব্যের বিভিন্ন পর্যায়ে সতীর্থদের কখনো হাসতে, আবার কখনো আবেগে অশ্রুসিক্ত হতে দেখা যায়।
বিদায়ী বক্তব্যে মেসি বলেন, দীর্ঘ দুই দশক ধরে আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য তিনি কখনো লড়াই থামাননি। সবচেয়ে কঠিন সময়েও সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং নিজের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন।
মেসি বলেন, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আর খেলতে না পারার বিষয়টি তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেবে। সুযোগ থাকলে তিনি সারা জীবন দেশের হয়ে খেলতে চাইতেন। কারণ তার কাছে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বিষয়।
২০২২ বিশ্বকাপের স্মৃতিচারণ করে মেসি বলেন, তখন শুধু নিজের স্বপ্ন নয়, পুরো দেশের স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষা ছিল। বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা জয়ের অভিজ্ঞতার জন্য জাতীয় দলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
মেসি আরও বলেন, এই সাফল্য শুধু ২০২২ সালের বিশ্বকাপ কিংবা শেষ বিশ্বকাপের গল্প নয়। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনেক আগে থেকেই অসংখ্য সতীর্থ আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য তার সঙ্গে লড়াই করেছেন। তাদের প্রত্যেকের অবদান তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
সতীর্থদের প্রসঙ্গে মেসি বলেন, মাঠে এমন সব যোদ্ধা তার পাশে ছিলেন, যারা দলের জন্য নিজেদের সবটুকু দিতে প্রস্তুত ছিলেন। বড় অর্জন পেতে একটি শক্তিশালী দলের প্রয়োজন এবং কঠিন মুহূর্তেই একটি দলের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নিজের স্বপ্ন পূরণে সতীর্থদের অবদানের কথা তুলে ধরে মেসি বলেন, এই দল তাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার মানুষের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আর্জেন্টিনার ম্যাচে সমর্থকদের উপস্থিতির কথা স্মরণ করে মেসি বলেন, দূরত্ব বা ম্যাচের গুরুত্ব বিবেচনা না করে সমর্থকেরা সবসময় দলের পাশে থেকেছেন। তাই বিদেশের মাঠেও অনেক সময় তাদের নিজেদের ঘরের মাঠে খেলার অনুভূতি হয়েছে।
সমর্থকদের উদ্দেশে মেসি বলেন, কঠিন সময় এলেও জাতীয় দলের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে। দলকে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে নিজের অন্যতম আনন্দের স্মৃতির কথাও তুলে ধরেন মেসি। বিশ্বকাপ জয়ের পর ঘরের মাঠে প্রথম ম্যাচ খেলার দিনটিকে জীবনের অন্যতম আনন্দের দিন হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। আর বিদায়ের দিনটিকে জীবনের অন্যতম দুঃখের দিন হিসেবে বর্ণনা করেন।
মেসি বলেন, তিনি আর্জেন্টিনার মানুষকে খুব মিস করবেন। তবে জাতীয় দলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ খেলোয়াড়দের সমর্থন করে যাবেন বলেও জানান।
বিদায়ী বক্তব্যের শেষদিকে আবেগ সামলাতে গিয়ে মেসি বলেন, এই মুহূর্তে তার ভেতর দিয়ে আবেগের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। অনেক কথা ভুলে যেতে পারেন বলেও জানান তিনি। এ সময় সবার আগে তার বাবার কথা মনে পড়ছে বলে উল্লেখ করেন আর্জেন্টাইন তারকা।
শেষে মেসি বলেন, জাতীয় দলের হয়ে আর খেলতে না পারাটা তিনি খুব মিস করবেন। নিজেকে আর্জেন্টাইন হিসেবে পরিচয় দিতে পেরে গর্বিত বলেও জানান তিনি।
কৃতজ্ঞতা, গর্ব ও শান্তি নিয়ে জাতীয় দল থেকে বিদায় নেওয়ার কথা জানিয়ে মেসি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।’










