সৌদি জোটের দাবি, প্রতিহত করা হয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র; হামলা ঘিরে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ, হুতিদের কঠোর সমালোচনা ট্রাম্পের
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে টানা তৃতীয় দিনের মতো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধাদের ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জোটটি।
ধারাবাহিক এসব হামলায় সৌদি আরবে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয়, হামলার স্থান এবং হতাহতের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। হামলার ঘটনায় দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এদিকে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কঠোর সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সোমবার (১২ অক্টোবর) রিয়াদ ও খামিস মুশাইত ছিল হুতিদের হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু। হুতি বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া কাসিম সারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এসব হামলার দায় স্বীকার করেন। তাঁর দাবি, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং খামিস মুশাইতের একটি সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, হুতিরা রিয়াদ লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এ ছাড়া দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে আরও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
জোটের দাবি, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রিয়াদ লক্ষ্য করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কোথায় গিয়ে পড়েছে, প্রতিহত করার সময় কোনো ধ্বংসাবশেষ জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পড়েছে কি না কিংবা এসব ঘটনায় নতুন করে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
হুতিদের পক্ষ থেকে হামলার দায় স্বীকার করা হলেও সৌদি আরবের সামরিক কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য এবং হুতিদের বক্তব্যের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
হুতি বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া কাসিম সারী তাঁর এক্স পোস্টে দাবি করেন, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। পাশাপাশি খামিস মুশাইত এলাকার একটি সৌদি সামরিক বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমান পরিবহনকেন্দ্র। এ বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে যাত্রী পরিবহন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনায় প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সময়সীমা শনিবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে বিমানবন্দরটির কোন কোন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে, সব ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে কি না এবং বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।
এ ছাড়া সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের কিং ফাহাদ বিমানবন্দরেও ধারাবাহিক হামলার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এসব স্থাপনার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় বিমান চলাচলের ওপর সংঘাতের প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
হামলার দায় স্বীকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ও ভ্রমণকারীদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়েছেন হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া কাসিম সারী।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনা ছাড়া দেশটির অন্য অঞ্চলের আকাশসীমাকে নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ও ভ্রমণকারীদের সৌদি আরব ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আহ্বান জানান তিনি।
তবে এটি হুতি পক্ষের দেওয়া সতর্কবার্তা। সৌদি আরবের আকাশসীমার প্রকৃত নিরাপত্তা পরিস্থিতি নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থাগুলোর নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
ক্ষতিগ্রস্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ আকাশপথ এড়িয়ে চলা, ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমান সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা বাস্তবে কোন মাত্রায় নেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।
ধারাবাহিক হামলার মধ্যে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তা নিয়েও বিভিন্ন দাবি সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে তাঁকে জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না। নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় তিনি সাধারণ প্রাসাদ ছেড়ে বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে যুবরাজের অবস্থান, তাঁর নিরাপত্তাব্যবস্থা কিংবা বাঙ্কারে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। তাই এ দাবিগুলো নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে সংঘাতের সময় নানা ধরনের তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারি বিবৃতি বা নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন যাচাই ছাড়া কোনো দাবিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলার ঘটনায় হুতিদের কঠোর সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হুতিদের আচরণ অত্যন্ত খারাপ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
হামলা অব্যাহত রাখার বিষয়ে হুতি যোদ্ধাদের হুঁশিয়ারির মধ্যেই ট্রাম্পের এই প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। সৌদি আরবের মতো যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদারের নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ উদ্ধৃতি, মন্তব্যের সময় এবং হুতিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও তথ্য প্রয়োজন।
সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে রাজধানী, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার দাবি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।
এসব হামলা অব্যাহত থাকলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
তবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী হামলার মাত্রা, সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।
সব মিলিয়ে, রিয়াদ ও খামিস মুশাইতকে লক্ষ্য করে হুতিদের ধারাবাহিক হামলার দাবি সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। সৌদি জোট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানালেও হতাহতের সংখ্যা, বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম এবং যুবরাজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রচারিত দাবিগুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।
সূত্র: সরবরাহ করা প্রতিবেদনের তথ্য।












