সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের হাতে লেখা কয়েকটি পাতায় সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণার অনুভূতি এবং আত্মমর্যাদা রক্ষার আকাঙ্ক্ষার কথা উঠে এসেছে। ১৯ বছর বয়সী মরিয়মের লেখা এসব পাতায় সম্পর্ক নিয়ে হতাশা ও মানসিক কষ্টের পাশাপাশি ধর্মীয় আমল ও প্রার্থনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
মরিয়মের বিছানার ওপর থেকে তাঁর লেখা কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়। মামলার এজাহারেও এসব লেখার কয়েকটি অংশের কথা উল্লেখ করেছেন তাঁর বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ। তবে এসব লেখা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বা ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে না; বিষয়গুলো তদন্তের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যালোচনা করছে।
জাতীয় সংসদের অফিশিয়াল প্যাড ও সাধারণ কাগজে লাল ও কালো কালিতে লেখা কয়েকটি পাতায় মরিয়ম তাঁর সম্পর্কের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। একটি লেখায় তিনি বিশ্বাস করে সম্পর্কের লড়াইয়ে নেমেও শেষ পর্যন্ত নিজেকে পরাজিত মনে করার কথা লিখেছেন। সেখানে সম্পর্কের বিপরীত অবস্থানে থাকা ব্যক্তিকে নিয়ে তাঁর গভীর আক্ষেপের প্রকাশ পাওয়া যায়।
অন্য একটি লেখায় সম্পর্কের অধিকার নিয়ে তাঁর দ্বন্দ্বের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ওই ব্যক্তি আগে থেকেই অন্য এক নারীর স্বামী ছিলেন। একই লেখায় কাউকে ভাগ করে পাওয়ার চেয়ে সম্পর্ক থেকে সরে আসাকে আত্মমর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করেছেন মরিয়ম।
আরেকটি চিরকুটে সরল বিশ্বাসে প্রতারিত হওয়ার অনুভূতির কথা উঠে এসেছে। সেখানে সম্পর্ককে একটি ‘খেলা’ হিসেবে দেখানোর পর নিজেকে সেই খেলায় ব্যবহৃত একটি ঘুঁটির সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। এতে সম্পর্কের বিষয়ে তাঁর হতাশা ও প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে বলে লেখাগুলো থেকে প্রতীয়মান হয়।
আরেকটি পাতায় নিজের বিশ্বাসের কারণে প্রতারিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, তিনি হেরেছেন কারণ তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। একই সঙ্গে নিজের আত্মমর্যাদা নিয়েও দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। একটি লেখায় তিনি মায়ার কারণে বারবার নত হওয়ার কথা বললেও নিজেকে অবমূল্যায়ন করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
উদ্ধার হওয়া নথির মধ্যে ‘১২-০৭-২০২৬’ তারিখ লেখা একটি পাতাও রয়েছে। সেখানে ঘুমানোর আগে পড়ার কয়েকটি ধর্মীয় আমল ও দোয়ার তালিকা লেখা ছিল। এতে কালেমা, দরুদ শরিফ, ঘুমের দোয়া, আয়াতুল কুরসি, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম, ইস্তিগফারসহ বিভিন্ন আমলের উল্লেখ রয়েছে।
চিঠিগুলোর বিষয়বস্তুতে একদিকে সম্পর্ক নিয়ে হতাশা, ক্ষোভ ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন উঠে এসেছে, অন্যদিকে ধর্মীয় প্রার্থনার মাধ্যমে মানসিক আশ্রয় খোঁজার চেষ্টার কথাও দেখা যায়। তবে এসব ব্যক্তিগত লেখা থেকে মরিয়মের মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণ করা যায় না।
এর আগে রোববার রাতে ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করলে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মামলায় মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকেও আসামি করা হয়েছে।
এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন। রিমান্ড আবেদনের শুনানি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে হওয়ার কথা রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, উদ্ধার হওয়া লেখাপত্র এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদসহ তদন্তের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে। ফলে চিঠিগুলোতে উঠে আসা অভিযোগ বা অনুভূতির পাশাপাশি তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।












