রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল সরবরাহ চুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে মতবিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে জেলেনস্কি বলেছেন, এ চুক্তির ফলে মস্কো নতুন করে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পাবে, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ব্যবহার করা হতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেনের এখন এমন একজন নতুন নেতা বেছে নেওয়া উচিত, যিনি রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন।
শনিবার হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলার অনুমতি দিয়ে জেলেনস্কি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছেন। ট্রাম্পের মতে, এ ধরনের হামলা বন্ধ করা প্রয়োজন, কারণ এর প্রভাব শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং বিশ্ববাজারেও সংকট সৃষ্টি করছে।
ট্রাম্প আরও বলেন, ইউক্রেনের এমন একজন নেতা প্রয়োজন, যিনি রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবেন। তাঁর দাবি, জেলেনস্কির সামনে চুক্তি করার সুযোগ থাকলেও তিনি তা কাজে লাগাচ্ছেন না। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইউক্রেনের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে নিজের অসন্তোষ আবারও প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে ইউক্রেনে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। সে সময় তিনি বলেছিলেন, জেলেনস্কিকে পরিবর্তন করার সুযোগ ইউক্রেনের ভোটারদের দেওয়া উচিত। এবারও তাঁর বক্তব্যে ইউক্রেনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
শুক্রবার ট্রাম্প জানান, রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা ৭ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত রাখার বিষয়ে মস্কোর সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে কয়েক ধাপে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সরবরাহ করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের কথা রয়েছে। এরপর নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন সরবরাহ করা হবে বলে জানান ট্রাম্প।
ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে আরও লিখেছেন, পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। এর পর অল্প সময়ের মধ্যে আরও ৩০ লাখ টন সরবরাহের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তবে শেষ পর্যায়ের সরবরাহ রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারগুলোর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে বলে জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন জেলেনস্কি। তাঁর মতে, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে দেশটি অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারবে। সেই অর্থ দিয়ে সামরিক সরঞ্জাম কেনা এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে পারে মস্কো। ফলে চুক্তিটি রাশিয়ার জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করবে বলে মনে করছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
জাপোরিঝঝিয়ায় রাশিয়ার নতুন প্রাণঘাতী হামলার পরও মস্কোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান জেলেনস্কি। তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়া এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যাতে তারা একদিকে জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় করতে পারে, অন্যদিকে ইউক্রেনের শহরগুলোতে হামলা অব্যাহত রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরানবিরোধী যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। সাধারণত বিশ্বের মোট তেলজাতীয় পণ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেন সাম্প্রতিক সময়ে একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহন স্থাপনায় হামলা জোরদার করেছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটিতে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ায় ডিজেল উৎপাদন আনুমানিক ৩০ শতাংশ কমেছে।
এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়ার আয় বাড়লে তা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় কাজে লাগতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার ডিজেল চুক্তির সমালোচনা করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস। তিনি জেলেনস্কির বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার ফলে মস্কো যুদ্ধ পরিচালনার জন্য আরও বেশি রাজস্ব পেতে পারে।
কালাস জানান, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার একটি বড় প্যাকেজ অনুমোদনের পরিকল্পনা করছেন ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর এটি সবচেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞার প্যাকেজ হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘প্রতীকী ও ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইউক্রেনের এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা প্রকৃত অর্থেই শান্তি প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী।
শনিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি কয়েকটি মিত্রদেশের নেতার সঙ্গে কথা বলেন। আলোচনায় ইউক্রেনের সর্বশেষ পরিস্থিতি, সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা এবং ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এ সময় তিনি কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানান।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র জানান, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে সামরিক আইন জারি রয়েছে। এ কারণে দেশটিতে নির্বাচন স্থগিত আছে। ফলে ট্রাম্পের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আহ্বান বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি প্রশ্নও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমীকরণেও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজনীয়তা এবং রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার আর্থিক সক্ষমতা সীমিত করার লক্ষ্য—এই দুইয়ের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা হবে, তা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।












