দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আবারও নির্বাচনী আবহে ফিরতে যাচ্ছে দেশের তৃণমূলের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। সারাদেশের ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) সাত ধাপে নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ভোটের মধ্য দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হতে পারে। প্রথম ধাপে প্রায় ৮০টি উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদকে নির্বাচনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে ইউপি নির্বাচন নিয়ে প্রাক্-প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি জানান, সাত ধাপে ভোট আয়োজনের বিষয়ে কমিশন প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণা করা হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও পরবর্তী প্রস্তুতির পর সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে।
ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপের ভোট হতে পারে ১২ নভেম্বর। দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর। এরপর আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি চতুর্থ ধাপ, ৪ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম ধাপ, ২২ এপ্রিল ষষ্ঠ ধাপ এবং ২৭ মে সপ্তম ও শেষ ধাপের ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ নভেম্বর থেকে শুরু করে আগামী বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় মাস ধরে বিভিন্ন ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পরিচালনার পরিকল্পনা করছে কমিশন। প্রথম তিন ধাপ নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার পর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আরও দুই ধাপ এবং পরে এপ্রিল ও মে মাসে শেষ দুই ধাপে ভোট নেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে এসব তারিখকে এখনই চূড়ান্ত নির্বাচনী তফসিল হিসেবে দেখা হচ্ছে না। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রাথমিক সময়সূচি নিয়ে আরও প্রস্তুতি ও আলোচনা প্রয়োজন। ১৭ সেপ্টেম্বর কমিশনের আরেকটি প্রস্তুতিমূলক সভায় বিষয়টি আরও এগিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রথম ধাপে দেশের প্রায় ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কোন কোন ইউনিয়ন প্রথম ধাপে থাকবে, তা পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট করে জানানো হবে। প্রথম ধাপের অভিজ্ঞতা পরবর্তী ধাপের ভোট ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোটকেন্দ্র পরিচালনা ও মাঠ প্রশাসনের সমন্বয়ে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকবে।
একসঙ্গে দেশের কয়েক হাজার ইউনিয়নে ভোট না নিয়ে সাত ধাপে নির্বাচন আয়োজনের ফলে কমিশনের প্রশাসনিক চাপও ধাপে ধাপে ভাগ হয়ে যাবে। ব্যালট, ভোটকেন্দ্র, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, রিটার্নিং কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাঠ প্রশাসনের সমন্বয়ও পর্যায়ক্রমে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
ইউনিয়ন পরিষদ দেশের স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে বিস্তৃত ও জনগণের কাছাকাছি থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। স্থানীয় অবকাঠামো, সড়কবাতি, পানি ও স্যানিটেশন, সামাজিক নিরাপত্তাসহ নানা নাগরিক সেবায় ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা রয়েছে। ফলে চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচন শুধু স্থানীয় নেতৃত্ব নির্ধারণের বিষয় নয়, এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সেবা পাওয়ার বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত।
তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব তৈরিতেও ইউপি নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনের মাধ্যমে অনেক নেতা পরবর্তী সময়ে উপজেলা ও জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসেন। ফলে দীর্ঘ বিরতির পর ইউপি নির্বাচন ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক তৎপরতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এবারের নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তৃতীয় ধাপের প্রস্তুতির সময় এ আলোচনা হতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ, স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে এসব আলোচনায় মতামত নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে আচরণবিধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভোটকে গ্রহণযোগ্য করার বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউপি নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা। স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কের প্রভাব থাকায় অনেক সময় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, আচরণবিধি বাস্তবায়ন এবং ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে অর্থের প্রভাব, ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা, আচরণবিধি লঙ্ঘন কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ভয়ভীতি দেখানোর মতো অভিযোগ ঠেকাতেও কমিশনকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে এসব বিধি কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, সেটিও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাংলাদেশে সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ সাধারণ নির্বাচন ২০২১ সালে একাধিক ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়নকে সাত ধাপে নির্বাচনের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে এটি হবে বড় পরিসরের একটি দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচনী কর্মযজ্ঞ।
প্রাথমিক সময়সূচি অনুযায়ী ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপ শুরু হয়ে ২৭ মে সপ্তম ধাপে শেষ হলে প্রায় সাত মাস ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী কার্যক্রম চলবে। এক ধাপের ভোট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি নিতে হবে কমিশনকে। ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, কর্মকর্তা নিয়োগ, ব্যালট ও নির্বাচনী সরঞ্জাম সরবরাহ এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ সময় ধরে সমন্বয় বজায় রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে সাত ধাপে ৪ হাজার ৫৮০ ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা দেশের তৃণমূল রাজনীতিতে নতুন করে নির্বাচনী তৎপরতা তৈরি করতে যাচ্ছে। তবে সম্ভাব্য তারিখগুলো এখনো চূড়ান্ত নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা, মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি এবং কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের পরই চূড়ান্ত তফসিল ও কোন ইউনিয়ন কোন ধাপে ভোটে যাবে, তা স্পষ্ট হবে।
শেষ পর্যন্ত এই বিশাল নির্বাচনী আয়োজনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা, প্রার্থীদের সমান সুযোগ দেওয়া এবং ভোটের ফলাফল নিয়ে মানুষের আস্থা তৈরি করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।












