সংসার যেখানে একজন নারীর নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, অনেকের জন্য সেই ঘরই হয়ে উঠছে আতঙ্কের জায়গা। মারধর, হুমকি, যৌতুকের চাপ, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন—বিভিন্নভাবে চলতে থাকা পারিবারিক সহিংসতার ভয়াবহ পরিণতি কখনো কখনো গড়াচ্ছে মৃত্যুর দিকে। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর আগেই নির্যাতনের নানা আলামত সামনে এলেও সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও সামনে এনেছে ঘরের ভেতরের সহিংসতার এই নির্মম বাস্তবতা। রাজধানীর খিলক্ষেতে মুক্তা ইসলামের মৃত্যুর আগে নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের অভিযোগ, স্বামীর নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে গাইবান্ধার তরুণী আল মাইদা আক্তার মৃত্যুর কিছুদিন আগে আহত মুখের ছবি স্বজনের কাছে পাঠিয়ে স্বামীর মারধরের কথা জানিয়েছিলেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়—এমন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন পরিসংখ্যানেও। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা সংকলন অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত স্বামীর হাতে অন্তত ১ হাজার ২৭৪ নারী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২০ সালে ২৪০, ২০২১ সালে ২২৪, ২০২২ সালে ২০৬, ২০২৩ সালে ২০৭, ২০২৪ সালে ১৮০ এবং ২০২৫ সালে ২১৭ জন নারী নিহত হন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আরও ১০৮ নারী স্বামীর হাতে নিহত হয়েছেন বলে আসকের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই হিসাবে ২০২০ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত স্বামীর হাতে নিহত নারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ১ হাজার ৩৮২।
তবে এই পরিসংখ্যানকে পূর্ণাঙ্গ চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আসকের হিসাব মূলত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা থেকে সংগৃহীত। ফলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত না হওয়া, স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকা কিংবা অন্যভাবে নথিভুক্ত হওয়া বহু ঘটনা এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারে। বাস্তব পরিস্থিতি তাই আরও উদ্বেগজনক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নারী নির্যাতনের আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্যেও। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নারী নির্যাতনের অভিযোগে ২৭ হাজার ৯১১টি কল এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ হাজার ১৯৬টি অভিযোগ ছিল স্বামীর হাতে নির্যাতনসংক্রান্ত। অর্থাৎ মোট অভিযোগের প্রায় ৬২ শতাংশই এসেছে স্বামীর বিরুদ্ধে।
এই হিসাবে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০টি করে অভিযোগ এসেছে স্বামীর নির্যাতন নিয়ে। আগের বছরের তুলনায় মোট অভিযোগের মধ্যে স্বামীর হাতে নির্যাতনের অনুপাতও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’-এর তথ্যও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বামী বা জীবনসঙ্গীর হাতে শারীরিক, যৌন, মানসিক বা অর্থনৈতিক সহিংসতা কিংবা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। আগের ১২ মাসেও এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন প্রায় ৪১ শতাংশ নারী।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেমের মতে, পারিবারিক সহিংসতার শুরু অনেক সময় ছোটখাটো মতবিরোধ, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা মানসিক চাপ দিয়ে হলেও ধীরে ধীরে তা গুরুতর নির্যাতনে রূপ নিতে পারে। দীর্ঘদিন নির্যাতন সহ্য করার পর অনেক নারী যখন সাহায্য চাইতে এগিয়ে আসেন, তখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে।
তিনি মনে করেন, নির্যাতনের পর শুধু আশ্রয় দেওয়াই যথেষ্ট নয়। একজন নারীর নিরাপত্তা, আর্থিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতাকে নিছক ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে অপরাধ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক সহিংসতার অন্যতম বড় বাধা হলো এটিকে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার সামাজিক প্রবণতা। নির্যাতনের শিকার নারীকে সন্তান, সামাজিক মর্যাদা কিংবা সংসারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেক সময় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে নির্যাতনকারী আরও সুযোগ পায় এবং ভুক্তভোগী নারী ধীরে ধীরে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ‘আমরাই পারি’র প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হকের মতে, শুধু আইন পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তনের পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা দূর করে পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কার্যকর ও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
মুক্তা, মাইদা এবং সাম্প্রতিক আরও কয়েকটি ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—চূড়ান্ত বিপর্যয়ের আগে অনেক সময় নির্যাতনের সংকেত সামনে আসে। কখনো ভিডিও, কখনো আহত অবস্থার ছবি, আবার কখনো স্বজনের কাছে সাহায্যের আকুতি হয়ে সেই সংকেত প্রকাশ পায়। কিন্তু সেই সংকেত কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কারণ পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধের উদ্যোগ শুধু হত্যার পর শুরু হলে চলবে না। একজন নারী প্রথমবার নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরই যদি নিরাপদ আশ্রয়, আইনি সহায়তা এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পান, তাহলে অনেক বড় বিপর্যয় হয়তো ঠেকানো সম্ভব। ঘরকে নারীর জন্য সত্যিকারের নিরাপদ করতে তাই প্রয়োজন নীরবতা ভাঙা, অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নির্যাতনের শুরুতেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।












