ফ্রান্সে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও স্কুল অবরোধকে কেন্দ্র করে দেশটির বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করে। জবাবে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। দিনব্যাপী পরিস্থিতিতে ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। আটক ব্যক্তিদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে।
গত সপ্তাহে প্যারিসের আশপাশের ইল-দ্য-ফ্রান্স অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট, দীর্ঘ ও অসুবিধাজনক ক্লাসসূচি এবং সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে শ্রেণিকক্ষ অতিরিক্ত গরম হয়ে ওঠা।
ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দেশটির প্রায় ৩ হাজার ৭০০ উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০০টি কোনো না কোনোভাবে বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ কর্মসূচির কারণে বিঘ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি স্কুল অবরুদ্ধ ছিল এবং আরও ৪৪টি প্রতিষ্ঠানে অবরোধের চেষ্টা হয়েছে।
বিক্ষোভের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। উত্তরাঞ্চলীয় লিলে একটি স্কুলের সামনে মুখোশধারী শিক্ষার্থীরা আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল, পাথর ও অন্যান্য বস্তু ছোড়া হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। নঁতে শহরে শিক্ষার্থীরা আবর্জনার পাত্র জড়ো করে স্কুলের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়। প্যারিসের উপকণ্ঠসহ মার্সেই, বোর্দো ও লিওনেও উত্তেজনা ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, মঙ্গলবারের সংঘর্ষে ৪৮ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য আহত হয়েছেন। কিছু ঘটনায় পুলিশকে লক্ষ্য করে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার গেফ্রে বিক্ষোভে সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, সহিংস কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, স্কুল অবরোধ আরও বাড়ানোর আহ্বান শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পাশাপাশি মঙ্গলবার ফ্রান্সজুড়ে সরকারি খাতের বিভিন্ন কর্মী ও শ্রমিক সংগঠন বাজেট পরিকল্পনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও ধর্মঘট পালন করেছে। সরকারি কর্মীদের বেতন ও জনসেবা খাতে ব্যয় নিয়ে ইউনিয়নগুলোর আপত্তির মধ্যেই এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দাবি করেছে, দেশজুড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষ তাদের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। তবে পুলিশের হিসাবে প্যারিসে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ হাজার। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের বাজেট পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু শিক্ষার্থীদের কিছু দাবিকে স্বীকৃতি দিলেও বিক্ষোভে সহিংসতার সমালোচনা করেছেন। তাঁর সরকার ও বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবোডের মধ্যে আন্দোলনকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও দেখা দিয়েছে। ফ্রান্স আনবোডের নেতারা শিক্ষার্থীদের দাবিকে সমর্থন করেছেন এবং সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় সম্পদের ঘাটতির অভিযোগ তুলেছেন।
প্যারিসের নিম্নআয়ের এলাকা সেন-সাঁ-দেনিতে কয়েক শ শিক্ষার্থীর বিক্ষোভে স্থানীয় মেয়র ও ফ্রান্স আনবোডের নেতা বালি বাগায়োকো অংশ নেন। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবিকে বৈধ বলে উল্লেখ করে নিম্নআয়ের এলাকাগুলো তুলনামূলকভাবে কম সরকারি সম্পদ পায় বলে অভিযোগ করেন।
ফ্রান্সে উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এখন শিক্ষা খাতের নির্দিষ্ট সমস্যার পাশাপাশি বৃহত্তর সরকারি ব্যয় ও বাজেট বিতর্কের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে স্কুল অবরোধ ও শ্রমিক ধর্মঘট অব্যাহত থাকে কি না, সেটিই এখন পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।












