দিল্লিতে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি এবং দুই আন্দোলনকারীর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কাকরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ঘোষিত ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ পতাকা মিছিল ঘিরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মিছিল শুরুর কয়েক মিনিট আগে দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপককে নিজ বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশ।
মিছিলকে কেন্দ্র করে কনট প্লেস ও মধ্য দিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর মোট ৩২ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে সেন্ট্রাল পার্ক বন্ধ রাখা হয় এবং রাজীব চক, প্যাটেল চক ও সংসদ মার্গসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড বসানো হয়।
সিজেপির পক্ষ থেকে জানানো কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল দলটির দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি জানানো। এর আগে মঙ্গলবার যন্তর মন্তরের বন্ধ ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশের অভিযোগে ওই দুই নেতাসহ ১৪ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়।
এ ঘটনার পর নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিছিলের আগে পুলিশ তাঁর বাড়িতে গিয়ে কর্মসূচি না করার বিষয়ে নোটিশ দেয়। পরে তাঁকে আটক করা হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে এটি তাঁর দ্বিতীয়বার আটকের ঘটনা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কনট প্লেস ও আশপাশের এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে সিজেপির কয়েকজন সদস্যকে বিকল্প কোনো স্থানে সীমিত পরিসরে পতাকা মিছিলের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
আন্দোলনের মূল কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রম। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হিসাব অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটির বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত এবং ৩ কোটি শনাক্ত করা যায়নি—এমন ভোটারের নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এত বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নামও বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলে ধরে তারা সংশোধনপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে।
অন্যদিকে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, মৃত, স্থানান্তরিত, দ্বৈত নিবন্ধিত ও অযোগ্য ভোটারদের শনাক্ত করে তালিকা নির্ভুল করা নির্বাচনপ্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক অংশ। ভুলবশত বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও রয়েছে বলে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতাদের তৎপরতাও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্নের পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থান, চাকরির পরীক্ষায় অনিয়ম এবং শিক্ষার সুযোগ নিয়েও অসন্তোষের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে বিভিন্ন আন্দোলনকারী গোষ্ঠীর দাবি ও কর্মপদ্ধতি এক নয়।
এদিকে প্রতিবাদের অধিকার এবং নির্ধারিত স্থানে সমাবেশের অনুমতি নিয়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিরোধী নেতাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে জবাব চেয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে আদালতের জবাব চাওয়া কোনো পক্ষের অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা প্রমাণ করে না।
জনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতা থাকলেও শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকারও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে দিল্লির এই ঘটনাপ্রবাহে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিধিনিষেধের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সব মিলিয়ে, ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ পতাকা মিছিল ঘিরে দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার—এই তিনটি বিষয় এখন বিতর্কের কেন্দ্রে। তবে এ আন্দোলনের ফলে বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান বা ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ফলাফলে কী প্রভাব পড়বে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।












