ইরাকে থাকা অবশিষ্ট সব সামরিক ঘাঁটি থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে দুই দশকেরও বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশটিতে থাকা মার্কিন বাহিনীর চূড়ান্ত প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়। এর মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক উপস্থিতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সেনাদের চূড়ান্ত বিদায়ের পর ইরাকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা শূন্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরাকের কিছু নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকের আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি না থাকায় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়া ইসলামিক স্টেট বা আইএসের ঘুমন্ত নেটওয়ার্কগুলোও পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে।
ইরান ও দেশটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে নিজেদের জন্য রাজনৈতিক ও কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখছে। ইরাকের একটি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র জোটের কমান্ডার আবু মুজতাবা আল-ইয়াসিরি রয়টার্সকে এ প্রত্যাহারকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে এটি ওই গোষ্ঠীর বক্তব্য; ইরাকের সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের মধ্যে ২০২৪ সালে সেনা প্রত্যাহারের সময়সূচি নিয়ে সমঝোতা হয়েছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ে নির্ধারিত সেই পরিকল্পনা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সময়ে বাস্তবায়ন করে শেষ করা হলো।
ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সূচনা হয় ২০০৩ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাত করে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকে। ২০১১ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দফায় সেনা প্রত্যাহার করলেও ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পর আবার ইরাকে ফিরে আসে মার্কিন বাহিনী। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আইএসবিরোধী যুদ্ধে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করে তারা।
দুই দশকের বেশি সময়ের ইরাক যুদ্ধে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে। চলতি বছর ইরাকেও মার্কিন সেনা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ জুলাইয়ে এরবিলের কাছে একটি ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ নিয়ন্ত্রণের সময় এক মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরাকের অনেক নাগরিক দেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দিক থেকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে একই সঙ্গে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী মার্কিন বাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও অন্যান্য সহায়তা ছাড়া আইএসসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা হুমকি কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই দশকের অভিজ্ঞতায় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হলে তার প্রভাব গুরুতর হতে পারে।
তবে মার্কিন সামরিক প্রত্যাহারের অর্থ ইরাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের সম্পর্কের অবসান নয়। বরং সামরিক উপস্থিতির পরিবর্তে দুই দেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে কী ধরনের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে এগোয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।








