ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় অভিযানের প্রস্তুতি সৌদির, গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। সম্ভাব্য এই অভিযানের লক্ষ্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার এবং লোহিত সাগরে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা। অভিযানে সৌদি বিমান হামলার পাশাপাশি রিয়াদ-সমর্থিত ইয়েমেনি স্থলবাহিনী অংশ নিতে পারে বলে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ছয়জন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য অভিযানের দুটি প্রধান বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে। এর একটি হলো বাব আল-মান্দাব ঘিরে সীমিত পরিসরের উপকূলীয় অভিযান। অন্যটি হলো ইয়েমেনের একাধিক ফ্রন্টে একই সময়ে বড় আকারের সামরিক তৎপরতা। তবে অভিযানের সময় ও পরিধি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কর্মকর্তারা নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
সম্ভাব্য অভিযানে ইয়েমেনি স্থলবাহিনীর সংখ্যা এক লাখের বেশি হতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে এর কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে সৌদি-সমর্থিত বিভিন্ন ইয়েমেনি গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়, সামরিক সক্ষমতা ও সংগঠনের ওপর। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের কারণে এসব বাহিনীর মধ্যে বিভাজন ও পারস্পরিক বিরোধ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সৌদি আরবের হয়ে যুদ্ধে নামার পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। বিশেষ করে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে ওয়াশিংটনের সহায়তার পরিধি সীমিত রাখার সম্ভাবনাই বেশি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এর আগে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার কারণে সৌদি আরব নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ অংশে অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি অবস্থান শক্তিশালী করেছে। ১১ সেপ্টেম্বর তারা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছিল বলে ইয়েমেনি সরকারি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছিল।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ফলে এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। ইরান-সমর্থিত হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর রিয়াদ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে সামরিক জোট গঠন করেছিল। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে বড় সংঘাত কমে এলেও চলতি বছর আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রভাবে ইয়েমেনে আবার উত্তেজনা তীব্র হয়েছে।
নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীগুলো বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি বাহিনী এরই মধ্যে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছে; তবে শুধু বিমান শক্তি ব্যবহার করে তাদের অগ্রগতি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সম্ভাব্য বড় অভিযানকে ঘিরে সৌদি আরবের মিত্র দেশগুলোর সামরিক সহায়তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুরস্ক ও পাকিস্তান সৌদিকে সামরিক সরঞ্জাম ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে ফ্রান্স সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবস্থা ও সরঞ্জাম পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এসব দেশের সরাসরি ইয়েমেনের যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়টি অবশ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ২ অক্টোবর জানিয়েছেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্যদের আগামী সপ্তাহে রিয়াদে জরুরি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে হুতিদের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও আলোচনা হতে পারে। ইরান থেকেও হুতিদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার একটি প্রস্তাবের কথা এসেছে, যদিও সেটিকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব হিসেবে বর্ণনা করেননি দার। ফলে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তবে সৌদি আরবের সম্ভাব্য অভিযান কতটা বড় হবে এবং কখন শুরু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সময়সূচি এক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরুর সম্ভাবনা থেকে শুরু করে নভেম্বর পর্যন্ত বিস্তৃত। অভিযানের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে স্থানীয় ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর সংগঠন ও সক্ষমতার ওপর।
এদিকে ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত বাড়ায় মানবিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। রয়টার্সের ২ অক্টোবরের আরেক প্রতিবেদনে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ৭৪ শতাংশ পরিবার খাদ্যসংকটে রয়েছে এবং নতুন করে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
সব মিলিয়ে বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাত নতুন পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগও চলমান থাকায় আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।












