সাইবার অপরাধ দমন, ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং অনলাইন জগতে নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে কাজ করছে সরকার। তবে প্রস্তাবিত আইনে অপরাধ দমনের পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনটি কোনোভাবেই নিপীড়নমূলক আইনে পরিণত হতে দেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট অংশীজন, সাংবাদিক, সাইবার বিশেষজ্ঞ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান যেন আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে।
বর্তমানে অনলাইন ব্যাংকিং, ই-কমার্স, মোবাইল আর্থিক সেবা, ডিজিটাল লেনদেন এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা দ্রুত ডিজিটাল হওয়ার কারণে সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্বও বেড়েছে। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, পরিচয় জালিয়াতি, অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিং, ব্ল্যাকমেইল, যৌন হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, সেক্সটর্শন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডারে অননুমোদিত প্রবেশের মতো অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর আইনগত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
তবে নতুন আইনের খসড়াকে ঘিরে মূল বিতর্ক হচ্ছে—সাইবার অপরাধ দমনের নামে যেন বৈধ মতপ্রকাশ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সরকারের সমালোচনা বা জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত না হয়। এ কারণেই খসড়ার বিভিন্ন শব্দের সংজ্ঞা, শাস্তির মাত্রা, কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা এবং আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
অপরাধের পরিধি ও শাস্তির প্রস্তাব
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ডিজিটাল মানহানি, অপমান, বুলিং, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, অশ্লীল কনটেন্ট, সেক্সটর্শন ও ক্ষতিকর ডিজিটাল কনটেন্টের মতো বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, ডিজিটাল মানহানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে। নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি দ্বিগুণ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়ায় ‘মানহানি’ ও ‘অপমান’-এর সংজ্ঞাও নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তৈরি, ধারণ, সম্পাদনা বা প্রচার করা তথ্য, অডিও, ভিডিও, স্থিরচিত্র, গ্রাফিক্স কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত কনটেন্টও এর আওতায় আসতে পারে।
এ ছাড়া বুলিংয়ের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক এমন আচরণকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে, যা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি, ভয়ভীতি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা অন্য ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
গুজব ও অপতথ্যে কঠোর শাস্তির প্রস্তাব
খসড়ার সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবগুলোর একটি হলো গুজব ও অপতথ্য প্রচারের জন্য নতুন শাস্তির বিধান।
প্রস্তাবিত ২৬এ ধারায় সাইবার পরিসরে গুজব বা অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড, ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়ায় গুজব বলতে এমন ভিত্তিহীন বা যাচাই না করা তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে বোঝানোর প্রস্তাব রয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে বা করার সম্ভাবনা রাখে।
অন্যদিকে ‘ফেক নিউজ’ বা অপতথ্য বলতে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি, প্রকাশ বা প্রচার করা এমন মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে বোঝানোর প্রস্তাব রয়েছে, যার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি, জনগোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত করা, প্রতারিত করা বা ক্ষতিগ্রস্ত করা।
এই বিধান নিয়ে অধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের একটি বড় উদ্বেগ হলো—কোন তথ্য ‘গুজব’, কোনটি ‘অপতথ্য’ এবং কোন তথ্য যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে, সেটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যদি স্পষ্ট ও নিরপেক্ষ মানদণ্ড না থাকে, তাহলে আইনের প্রয়োগে ভিন্নতা তৈরি হতে পারে।
কনটেন্ট ব্লক ও অপসারণে বাড়তে পারে ক্ষমতা
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে অনলাইন কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষেত্রেও সরকারের ক্ষমতা সম্প্রসারণের কথা রয়েছে।
বর্তমান কাঠামোয় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পক্ষ থেকে কনটেন্ট ব্লকের অনুরোধ করার সুযোগ রয়েছে। নতুন খসড়ায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়সহ সরকার অনুমোদিত অন্যান্য সংস্থা বা বাহিনীকে কনটেন্ট ব্লকের অনুরোধ করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শুধু কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর নয়, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কনটেন্ট ব্লকের সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। মানহানিকর বা রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বলে বিবেচিত কনটেন্টের ক্ষেত্রেও ব্লক করার ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লকের প্রক্রিয়া নিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের জন্য বিধি তৈরির সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে কোনো সরকারি অনুরোধ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বা প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার কাঠামো তৈরি হতে পারে।
তবে কনটেন্ট ব্লকের ক্ষমতা সম্প্রসারণের সঙ্গে স্বচ্ছতা, নোটিশ, আপিল ও স্বাধীন নজরদারির ব্যবস্থা থাকা জরুরি বলে মনে করছেন অধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।
ব্লক করা কনটেন্টের তথ্য প্রকাশ নিয়েও পরিবর্তনের প্রস্তাব
খসড়ার আরেকটি আলোচিত দিক হলো ব্লক করা কনটেন্টের তথ্য প্রকাশের বিধানে পরিবর্তন। বর্তমান আইনে ব্লক করা কনটেন্ট সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য জানানোর একটি ব্যবস্থা রয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এই বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ ধরনের পরিবর্তনের ফলে কোনো কনটেন্ট কেন এবং কোন কর্তৃপক্ষের অনুরোধে ব্লক করা হলো—এ বিষয়ে জনসাধারণের জানার সুযোগ কতটা থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কিছু অপরাধে মোবাইল কোর্টের প্রস্তাব
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সাইবার আইনের কয়েকটি অপরাধের বিচার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে করার সুযোগ রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, অশ্লীল বা মানহানিকর কনটেন্ট প্রকাশ, অপমান ও বুলিংয়ের মতো কিছু অপরাধে মোবাইল কোর্টের এখতিয়ার দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে নারী বা শিশুকে ভুক্তভোগী করে সংঘটিত কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচার করার বিধান রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
অন্যদিকে গুজব ও ফেক নিউজ, হ্যাকিং, সাইবার সন্ত্রাস, ডিজিটাল চুরি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোয় অবৈধ প্রবেশের মতো গুরুতর অপরাধ সাইবার ট্রাইব্যুনালের আওতায় রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
এতে সাইবার অপরাধের ধরন অনুযায়ী বিচারিক এখতিয়ার ভাগ করার একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে। তবে দ্রুত বিচার ও বিচারিক সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেটিও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
অভিযোগের প্রতিকার ও আনব্লক করার সুযোগ
প্রস্তাবিত কাঠামোয় কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
কোনো ব্যক্তি মনে করলে তার কনটেন্ট অন্যায়ভাবে ব্লক করা হয়েছে, তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা আদালতের কাছে আনব্লক করার আবেদন করতে পারবেন—এমন ব্যবস্থার প্রস্তাব রয়েছে। আবেদন নিষ্পত্তির আগে সরকার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথাও খসড়ায় রয়েছে।
অভিযোগকারী ব্যক্তির পাশাপাশি তার আইনগত প্রতিনিধি, অভিভাবক, পরিবারের সদস্য বা বৈধ স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিকেও ‘ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি’ হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে।
অংশীজনদের প্রধান উদ্বেগ সংজ্ঞা ও প্রয়োগ নিয়ে
প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন শব্দ ও সংজ্ঞা নিয়ে নাগরিক সমাজ, অধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সাইবার অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা এবং মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার—তিনটি জটিল বিষয় একই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তার মতে, কয়েকটি ধারণার সংজ্ঞা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
টিআইবি খসড়ায় স্পষ্ট সংজ্ঞা, স্বাধীন নজরদারি, কার্যকর নোটিশ ও আপিল ব্যবস্থা এবং অর্থবহ অংশীজন পরামর্শের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
ARTICLE 19-সহ বিভিন্ন অধিকার সংগঠনও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অধিকার ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাকে সাইবার নিরাপত্তার সঙ্গে সমন্বয় করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
সেপ্টেম্বরের যৌথ বিবৃতিতে কয়েকটি সংগঠন বলেছে, ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘ডিজিটাল মানহানি’, ‘অপমান’ ও ‘বুলিং’-এর মতো শব্দের সংজ্ঞা যথেষ্ট স্পষ্ট না হলে সেগুলো প্রয়োগে অসঙ্গতি ও নির্বিচার ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ
CIVICUS, Robert & Ethel Kennedy Human Rights Center, Front Line Defenders এবং South Asians for Human Rights-এর যৌথ বিবৃতিতেও খসড়ার কয়েকটি বিধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
তাদের বক্তব্য, সাইবার অপরাধ ও নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সরকারের আইন করার দায়িত্ব রয়েছে। তবে সেই ব্যবস্থা যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জনস্বার্থে সাংবাদিকতার ওপর অযাচিত বিধিনিষেধ তৈরি না করে।
সংগঠনগুলো বিশেষ করে গুজব, অপতথ্য, ডিজিটাল মানহানি, অপমান ও বুলিংয়ের মতো অপরাধের বিস্তৃত সংজ্ঞা এবং কঠোর শাস্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
গণমাধ্যমের সুরক্ষায় দ্বিতীয় দফা পরামর্শ
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে গণমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিক এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের দ্বিতীয় দফা পরামর্শ সভায় খসড়াটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়। সভার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রস্তাবিত আইনকে নিপীড়নমূলক হতে দেওয়া হবে না এবং কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান যেন আইনের অপব্যবহারের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক।
সভায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ বা গ্রেপ্তারের আগে আদালতের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব আসে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার এ প্রস্তাবকে যুক্তিসংগত মনে করছে। অংশীজনদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক সুপারিশ পাওয়ার পর এটি বিলে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় বিবেচনা করা হবে।
এ ছাড়া মামলা ও আপিল নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের কথাও জানিয়েছেন তিনি। এর উদ্দেশ্য হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো ব্যক্তি যেন আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকেন, সে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
মিডিয়া কমিশনের প্রস্তাব
পরামর্শ সভায় গণমাধ্যমের জন্য আরও সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা কাঠামোর দাবি উঠে আসে।
দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সংশোধন ছাড়া আইনটি পাস হলে বাংলাদেশ ‘বৃহৎ কারাগারে’ পরিণত হতে পারে—এমন আশঙ্কা তিনি প্রকাশ করেন। তিনি গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে আইনের অপপ্রয়োগ ঠেকাতে সুরক্ষা এবং গণমাধ্যমসংক্রান্ত বিষয় দেখার জন্য কমিশনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনামও খসড়ায় আরও সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। সাংবাদিক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। সরকার এ প্রস্তাব গ্রহণ করেছে বলে বৈঠক-পরবর্তী আলোচনায় জানানো হয়।
মাহফুজ আনাম গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাইবার অপরাধ—দুই বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে পৃথক বিশেষজ্ঞ কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
সরকারের অবস্থান কী
সরকার বলছে, প্রস্তাবিত আইনটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ডিজিটাল পরিসরে নারী ও শিশুদের সুরক্ষা, সাইবার হয়রানি প্রতিরোধ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগে বলেছেন, গঠনমূলক সমালোচনা এবং চরিত্রহনন বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপমানজনক বক্তব্যকে একভাবে দেখা হবে না।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, খসড়াটি এখনো চূড়ান্ত নয়। মন্ত্রিসভা পর্যায়ে খসড়াটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে এটিকে আরও পরিমার্জনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জুলাইয়ে মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকেও নাগরিক অধিকার সুরক্ষা ও নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন সুপারিশের কথা জানানো হয়েছিল।
সাংবাদিকদের জন্য আদালতের অনুমতির প্রস্তাবও এখনো চূড়ান্ত আইনি বিধান নয়; এটি অংশীজনদের আলোচনায় উঠে আসা একটি প্রস্তাব, যা পরবর্তী আনুষ্ঠানিক সুপারিশের ভিত্তিতে খসড়ায় যুক্ত হতে পারে।
সামনে কী হতে পারে
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাংবাদিক, সম্পাদক, সাইবার বিশেষজ্ঞ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মতামত নিয়ে একটি পর্যালোচনা প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদকে এ প্রক্রিয়ার ফোকাল কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
সম্পাদক পরিষদ, অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স বা অ্যাটকো এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সুপারিশ সংগ্রহের পর খসড়ায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে। এরপর সংশোধিত খসড়া আবার জনসাধারণের মতামতের জন্য প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরবর্তী ধাপে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যালোচনা, মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং সংসদে বিল উত্থাপনের প্রক্রিয়া এগোবে। অর্থাৎ বর্তমানে আলোচিত শাস্তি, কনটেন্ট ব্লকিং, সাংবাদিকদের সুরক্ষা, মোবাইল কোর্টের এখতিয়ারসহ কোনো প্রস্তাবকেই চূড়ান্ত আইন হিসেবে ধরা যাচ্ছে না।
সাইবার নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের ভারসাম্য
ডিজিটাল অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় কার্যকর সাইবার আইন প্রয়োজন—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে মূলত ঐকমত্য রয়েছে। অনলাইন প্রতারণা, পরিচয় চুরি, সাইবার হয়রানি, শিশু যৌন নির্যাতন, সেক্সটর্শন, ব্ল্যাকমেইল, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর সাইবার হামলার মতো অপরাধ মোকাবিলায় আইনগত ব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে আইনটির প্রয়োগ যেন জনস্বার্থে সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তথ্য যাচাই, সরকারের সমালোচনা, মতামত প্রকাশ বা বৈধ অনলাইন বক্তব্যকে অযথা অপরাধের ঝুঁকিতে না ফেলে—সেই বিষয়েও অংশীজনদের জোরালো মতামত রয়েছে।
ফলে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন এখন শুধু কতগুলো নতুন অপরাধ ও কত বছরের শাস্তি যুক্ত হচ্ছে, তা নয়। কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতার ওপর কী ধরনের নজরদারি থাকবে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কীভাবে প্রতিকার পাবেন, সাংবাদিকদের জন্য কী ধরনের বিচারিক সুরক্ষা থাকবে, সংজ্ঞাগুলো কতটা নির্দিষ্ট হবে এবং আইন প্রয়োগে জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব বিষয়ও খসড়াটির চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।












