জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান কফি উৎপাদক দেশ ইন্দোনেশিয়া। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে কফি গাছের ফুল ও ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সামনে সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী খরার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এতে কৃষক, রপ্তানিকারক ও স্থানীয় কফি ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়ছে চাপ।
ইন্দোনেশিয়ার প্রধান কফি উৎপাদন অঞ্চল দক্ষিণ সুমাত্রা ও জাভার বিভিন্ন এলাকায় ফুল আসা ও ফল গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। ইউএসডিএর ইন্দোনেশিয়া কার্যালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিবৃষ্টির কারণে দক্ষিণ সুমাত্রার পার্বত্য অঞ্চলের রোবাস্তা কফির ফুল ফোটা ব্যাহত হয়েছে। মধ্য জাভার কিছু এলাকায় ভারী বৃষ্টিতে ফুল ঝরে পড়া এবং পরাগ ধুয়ে যাওয়ায় ফল গঠনের প্রক্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দক্ষিণ সুমাত্রার কফিচাষিদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিবৃষ্টির কারণে এবার অনেক এলাকায় ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে একাধিক মৌসুম সময় লাগতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে রোবাস্তা উৎপাদননির্ভর অঞ্চলগুলোতে আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় উৎপাদিত কফির বড় অংশই রোবাস্তা জাতের। আন্তর্জাতিক বাজারে রোবাস্তা মূলত ইনস্ট্যান্ট কফি ও বিভিন্ন কফি-ব্লেন্ড তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ইউএসডিএর হিসাবে, ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে ইন্দোনেশিয়ার রোবাস্তা উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ব্যাগে নেমে আসতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ কম। আরবিকাসহ মোট সবুজ কফি উৎপাদনের পূর্বাভাস ১ কোটি ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যাগ, যা ২০২৫-২৬ সালের সংশোধিত ১ কোটি ২৩ লাখ ৭০ হাজার ব্যাগের চেয়ে ৮ শতাংশ কম।
এর ফলে আন্তর্জাতিক উৎপাদন তালিকাতেও ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইউএসডিএর ২০২৫-২৬ সালের হিসাবে ইন্দোনেশিয়া ১ কোটি ২৩ লাখ ৭০ হাজার ব্যাগ উৎপাদন করে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম কফি উৎপাদক ছিল, ইথিওপিয়ার উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ ৬০ হাজার ব্যাগ। কিন্তু ২০২৬-২৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার উৎপাদন কমে গেলে ইথিওপিয়া তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আবহাওয়ার ঝুঁকি এখানেই শেষ নয়। ইউএসডিএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে মাঝারি মাত্রার এল নিনো পরিস্থিতির প্রভাবে ইন্দোনেশিয়ায় তুলনামূলক দীর্ঘ ও তীব্র শুষ্ক মৌসুমের ঝুঁকি রয়েছে। অতিবৃষ্টির পর দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিলে আগামী মৌসুমে কফি গাছের ফুল ও ফলন আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
উৎপাদন কমার সরাসরি প্রভাব পড়ছে রপ্তানিতেও। ইন্দোনেশিয়ার সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত বাজার-তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত কফি রপ্তানির মূল্য প্রায় ৬১ কোটি ৪০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম। একই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার সামগ্রিক কৃষিপণ্য রপ্তানির সরকারি পরিসংখ্যানেও কফির মাসভিত্তিক রপ্তানি মূল্যে ওঠানামা দেখা গেছে।
অথচ ২০২৫ সালে ব্রাজিলে সরবরাহ সংকটের সুযোগে ইন্দোনেশিয়ার কফি রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ঘাটতি ও তুলনামূলক উচ্চ মূল্যের সুবিধা পেয়েছিল দেশটি। কিন্তু এবার নিজের দেশেই উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেই সুবিধা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কাঁচামালের সংকটে স্থানীয় কফি ব্যবসাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। কফি বিন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও প্যাকেজিংয়ের ব্যয় বাড়ায় ছোট ক্যাফেগুলোর মুনাফা কমেছে বলে বাজার-সংশ্লিষ্টদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কিছু ছোট প্রতিষ্ঠানের মুনাফার হার প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে বড় কফি চেইনগুলো তুলনামূলক বেশি আর্থিক সক্ষমতার কারণে সরবরাহ সংকট কিছুটা সামাল দিতে পারলেও তাদেরও কাঁচামাল সংগ্রহে বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে।
কফি রপ্তানির ক্ষেত্রে পরিবেশগত শর্তও নতুন চাপ তৈরি করছে। ইউরোপীয় বাজারে বন উজাড় ও সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিয়ে কঠোর নিয়ম মানার প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে জলবায়ুজনিত উৎপাদন সংকটের পাশাপাশি কৃষকদের উৎস ও উৎপাদন পদ্ধতির তথ্য সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মান পূরণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইউএসডিএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে ইন্দোনেশিয়ার সবুজ কফি রপ্তানি প্রায় ৭০ লাখ ৬০ কেজির ব্যাগে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ উৎপাদন কমার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদা বজায় থাকায় রপ্তানির জন্য উপলব্ধ কফির পরিমাণেও চাপ পড়বে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা, ক্ষতিগ্রস্ত বাগানে পুনরায় চারা রোপণ, সার ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও সম্ভাব্য খরা—দুই ধরনের চরম আবহাওয়া একই উৎপাদন ব্যবস্থাকে আঘাত করলে কফি খাতের পুনরুদ্ধার সহজ হবে না।
ইন্দোনেশিয়ার এই সংকট শুধু স্থানীয় কৃষক বা রপ্তানিকারকদের সমস্যা নয়; দেশটি আন্তর্জাতিক রোবাস্তা সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হওয়ায় উৎপাদন কমে গেলে বৈশ্বিক কফি বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ইনস্ট্যান্ট কফি উৎপাদকদের জন্য সরবরাহ ও দামের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে জলবায়ু পরিবর্তন ইন্দোনেশিয়ার কফি শিল্পে এখন শুধু ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নয়, বরং উৎপাদন, রপ্তানি ও স্থানীয় ব্যবসায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অতিবৃষ্টি থেকে সম্ভাব্য খরা—এই আবহাওয়াগত অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশটির কফি খাত কত দ্রুত অভিযোজন করতে পারে, তার ওপরই আগামী কয়েক বছরের উৎপাদন ও রপ্তানির স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।












