রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার করেছে বলে জানা গেছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের স্বাক্ষরিত আদেশে ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে ডিএমপি সদর দপ্তরের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে ‘প্রশাসনিক কারণ’ উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে মিরপুর-১ এলাকায় অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার পরদিন শাহ আলী থানায় মামলা করেন। মামলায় হানিফ মিয়াকে নামীয় আসামি করে আরও প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।
মামলার এজাহার ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের দিকে দুই শতাধিক মুখোশধারী ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে। তারা নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, সরকারি টিকা, নগদ অর্থ ও বিভিন্ন সামগ্রী লুট করে। পরে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়।
স্বাস্থ্যকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লুট হওয়া সামগ্রীর মধ্যে আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি, ওষুধ, টিকা ও অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী ছিল। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে হামলা ও ভাঙচুরে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা।
ঘটনার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগ করেছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। শাহ আলী থানার তৎকালীন ওসি জাহাঙ্গীর আলমও পুলিশের উপস্থিতির বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে এসেছে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর ডিএমপি কমিশনার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে ৩ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে কোনো পুলিশ সদস্যের দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার।
এদিকে হামলার ঘটনায় এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর চারজনকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে পাঠানো হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তদন্তের অংশ হিসেবে আরও জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি প্রায় পাঁচ দশক ধরে মিরপুর এলাকার নিম্নআয়ের মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও শিশুর টিকাদানসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছিল। হামলার পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও উঠেছে। কিছু প্রতিবেদনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম এসেছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং তিনি একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি হামলায় জড়িত ছিলেন না এবং পুলিশকে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঘটনার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির আশপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।












