জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের দিনের বক্তব্যের জবাব দিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকির মুখেও ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। একই সঙ্গে তিনি কূটনীতির পথ খোলা রাখার কথাও জানিয়েছেন।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং সামরিক পদক্ষেপের অভিযোগ তুলে ধরেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের আগের দিনের বক্তব্যে ইরানকে চুক্তিতে আনতে ব্যর্থ হলে দেশটিকে ‘ধ্বংস’ করার হুমকির পর পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।
পেজেশকিয়ান বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ ইরানের জনগণের প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে একই সময়ে তিনি বিশ্বের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখার বার্তাও দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান দুর্বলতার কারণে নয়, নিজেদের সক্ষমতার জায়গা থেকেই সহযোগিতা ও কূটনীতির আহ্বান জানাচ্ছে।
ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট শক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতি পরিচালনার সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো দেশের ওপর রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য সমাধান নয়।
ভাষণের সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাও তুলে ধরেন। ইরানি কর্তৃপক্ষের হিসাবে ওই ঘটনায় ১২০ জন শিশু ও ২৬ জন শিক্ষক নিহত হন। এই সংখ্যাগুলো ইরানের দেওয়া হিসাব; হামলার দায় ও ঘটনাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলাদা তদন্ত ও বিতর্ক রয়েছে।
পেজেশকিয়ান নিহত শিশুদের ছবি প্রদর্শন করে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ও নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, ইরানকে সন্ত্রাসবাদের জন্য অভিযুক্ত করা হলেও ইরান নিজেই সন্ত্রাসের শিকার। তাঁর বক্তব্যে গাজা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা উঠে আসে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও অবস্থান স্পষ্ট করেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার থেকে সরে যাবে না। একই সঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়েও সতর্কবার্তা দেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, ইরানের বিরুদ্ধে চাপ বা আগ্রাসনের মাধ্যম হিসেবে এই জলপথকে ব্যবহার করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। এর আগে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান প্রস্তুত থাকতে পারে।
পেজেশকিয়ানের ভাষণের শুরুতে মার্কিন প্রতিনিধিদলের একজন কর্মকর্তা অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি প্রতিনিধিদলও ওই বক্তব্যে উপস্থিত ছিল না।
তবে কঠোর বক্তব্যের পাশাপাশি কূটনীতির সম্ভাবনাও পুরোপুরি বন্ধ করেননি পেজেশকিয়ান। জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চলার খবরও পাওয়া গেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, দুই পক্ষ যুদ্ধ অবসানের পথ নিয়ে এখনও অনেক দূরে অবস্থান করলেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।
ফলে জাতিসংঘে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের সম্ভাবনা—দুই বার্তাই একসঙ্গে উঠে এসেছে।












