দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে সমন্বিত সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ লক্ষ্যে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর পরিপালন জোরদার, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনকে সমন্বিত করে ‘ওয়ান এনবিআর’ কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির এই রূপরেখা উপস্থাপন করে এনবিআর। সংস্থাটির উপস্থাপনা অনুযায়ী, সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ এনবিআরের মাধ্যমে সংগৃহীত হয়। কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জনে শুধু করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের ভিত্তি সম্প্রসারণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্যনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা এবং করদাতার পরিপালন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর-জিডিপি অনুপাত প্রথম ধাপে স্বল্পমেয়াদে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে এবং মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এরপর ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজস্ব প্রশাসনে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং করদাতা সেবার উন্নয়নকে এই লক্ষ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বেশিরভাগ সময় ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। ২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মধ্যে এটি সাময়িকভাবে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছালেও পরবর্তী সময়ে আবার কমে যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনুপাতটি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়ায়। এনবিআরের উপস্থাপনায় এ অনুপাতকে দক্ষিণ এশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অত্যন্ত নিম্ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনবিআরের বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, পর্যালোচিত সময়ে সরকারের ব্যয়ের পরিমাণ ৪ দশমিক ৪৭ গুণ বাড়লেও এনবিআরের রাজস্ব আদায় বেড়েছে ৩ দশমিক ৪০ গুণ। এ সময়ে রাজস্ব আহরণে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে সরকারি ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রস্তাবিত সংস্কার কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘ওয়ান এনবিআর’। এর আওতায় আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনকে আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা হবে। পৃথক ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি সমন্বিত করদাতা ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলে অভিন্ন তথ্য ব্যবহার করে করদাতার ঝুঁকি মূল্যায়ন, কর পরিশোধ, পরিপালন পর্যবেক্ষণ এবং বকেয়া রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র রাজস্ব নীতি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, কর-ব্যয় রেজিস্টার এবং প্রতিটি করদাতার জন্য একক মাস্টার ডাটাবেজ তৈরির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রথম তিন বছরের মধ্যে সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট, তৃতীয় পক্ষের তথ্যের সঙ্গে করদাতার তথ্য যাচাই, অভিন্ন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বকেয়া রাজস্বের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কাস্টমস ব্যবস্থাপনাতেও আয়কর ও ভ্যাট প্রশাসনের সঙ্গে তথ্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষায়িত সীমান্ত তদারকি বজায় রেখে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের রাজস্ব ঝুঁকি-সংক্রান্ত তথ্য অন্যান্য কর প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী তিন থেকে পাঁচ বছরে তাৎক্ষণিক কর পরিপালন বিশ্লেষণ, আগে থেকে পূরণ করা রিটার্নের পরিধি বাড়ানো, কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড এবং কর ফাঁকি শনাক্তে উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতেও নীতিগত সুবিধা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক হ্রাস, কৃষি, নিত্যপণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভ্যাট অব্যাহতি এবং কাস্টমস সিঙ্গেল-উইন্ডো সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া তৈরি পোশাক, অটোমোবাইল ও বৈদ্যুতিক যান, মোবাইল হ্যান্ডসেট সংযোজন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ওষুধশিল্প, পুঁজিবাজার, স্বাস্থ্যসেবা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো উৎপাদনশীল খাতে বিদ্যমান কর সুবিধা ও প্রণোদনা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এনবিআরের এই দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো করের হার বাড়ানোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন, তথ্যের কার্যকর ব্যবহার এবং স্বেচ্ছায় কর পরিপালন বাড়ানোর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ শক্তিশালী করা। সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।












