নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে পূর্বানুমতি ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর-সংশ্লিষ্ট ছবি, ভিডিও ও পরিচালনাগত তথ্য প্রকাশ বা প্রচার না করতে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্মসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বন্দর-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও এই নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে বলে জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বন্দর ব্যবহারকারী ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্বানুমতি ছাড়া বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, যোগাযোগব্যবস্থা, জাহাজ, পণ্য ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম, নিয়ন্ত্রিত এলাকা এবং অবকাঠামো-সংশ্লিষ্ট ছবি, ভিডিও, নকশা ও পরিচালনাগত তথ্য প্রকাশ বা প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম স্বাক্ষরিত নোটিশটি বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক ও ব্যুরোপ্রধানদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, নির্দেশনা অমান্য করলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২ এবং অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এর অধীনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
তবে নির্দেশনাটি জারির সময় নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ১৫ বছরের জন্য বিদেশি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা ও আন্দোলন চলছে। আন্দোলনকারীরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মুনিরুজ্জামানের পদত্যাগ দাবি করেছেন। একই সঙ্গে আগামী ১৩ অক্টোবর চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচির কথাও জানিয়েছেন তারা।
এমন পরিস্থিতিতে বন্দর-সংশ্লিষ্ট ছবি, ভিডিও ও পরিচালনাগত তথ্য প্রকাশে পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, নিরাপত্তার স্বার্থে সংবেদনশীল স্থাপনা ও তথ্য সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন হলেও এর আওতা স্পষ্ট না হলে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সংবেদনশীল স্থাপনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরিচালনাগত ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতেই এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর এমনিতেই কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। এর মধ্যেই নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে কনটেইনার হারিয়ে যাওয়া এবং জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে পণ্যবোঝাই কনটেইনার বন্দর ফটক দিয়ে বের করে নেওয়ার অভিযোগ নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
ছবি ও ভিডিও ধারণের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন নিয়েও বাস্তবিক প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, বন্দরের বড় একটি অংশ বন্দরসংলগ্ন উঁচু উড়ালসড়কসহ বিভিন্ন স্থান থেকে দৃশ্যমান।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য জাফর আলম মনে করেন, বন্দর পরিচালনার ক্ষেত্রে ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট প্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, চট্টগ্রাম বন্দর একটি বহু পক্ষের অংশগ্রহণে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিভিন্ন অংশীজন ও কর্মীরা নিয়মিত কাজ করেন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার এই নির্দেশনাকে অগণতান্ত্রিক ও অসহিষ্ণু পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার অভিযোগ, বন্দরকে ঘিরে জনঅসন্তোষ ও বিভিন্ন অভিযোগের খবর প্রকাশ ঠেকাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে জাতীয় স্বার্থে প্রকৃত নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপকে তারা সমর্থন করবেন বলেও জানান তিনি।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের চট্টগ্রাম নগর শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আক্তার কবির চৌধুরীও নির্দেশনাটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় ছাড়া জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত।
সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেরিটাইম ল সোসাইটির সভাপতি মোহিউদ্দিন আবদুল কাদির বলেন, আন্তর্জাতিক জাহাজ ও বন্দর নিরাপত্তাবিধিতে সংবেদনশীল নিরাপত্তা তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের বিধান রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বন্দরের সঙ্গে সম্পর্কিত সব পরিচালনাগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে গোপনীয় হয়ে যাবে।
তার মতে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার হওয়ায় জাহাজ পরিচালনা, পণ্য পরিবহন, পণ্যজট, দুর্ঘটনা, অবকাঠামো ও বন্দর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তথ্যের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি, নৌপরিবহন ও বৃহত্তর অর্থনীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
ফলে নিরাপত্তার প্রয়োজনে কোন তথ্য সীমিত করা হবে এবং কোন তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট মানদণ্ড থাকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনস্বার্থ ও গণমাধ্যমের তথ্য প্রকাশের অধিকারও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নতুন নির্দেশনা তাই একদিকে বন্দরের নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষার প্রশ্ন সামনে এনেছে, অন্যদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশের সুযোগ নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে










