ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের বিধিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের জামানতের অর্থ বাড়ানোর পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যয়সীমা, প্রার্থীদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ, নির্বাচনী অপরাধের শাস্তি এবং সমান ভোটের ক্ষেত্রে ফল নির্ধারণের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। একই সঙ্গে আসন্ন ইউপি নির্বাচন হবে নির্দলীয় প্রতীকে।
১৬ সেপ্টেম্বর সংশোধিত বিধিমালায় সই করা হলেও বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীদের জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য প্রার্থীদের জামানত ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জামানত ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন কোনো প্রার্থী প্রদত্ত মোট ভোটের ১৫ শতাংশের কম পেলে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। আগে এক-অষ্টমাংশ ভোট পেলেই জামানত ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল। ফলে জামানত ফেরত পেতে এবার প্রার্থীদের তুলনামূলক বেশি ভোট অর্জন করতে হবে।
সমান ভোটের ক্ষেত্রে ফল নির্ধারণের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। আগের বিধানে দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমান ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের সুযোগ ছিল। সংশোধিত বিধিমালায় সেই ব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন সমান ভোট হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র বা কেন্দ্রগুলোতে পুনরায় ভোট গ্রহণ করা হবে।
এবার ইউপি নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না। সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের পর নতুন বিধিমালাতেও চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকের ব্যবস্থা বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর পরিবর্তে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্যদের জন্য নির্ধারিত স্বতন্ত্র প্রতীক ব্যবহার করা হবে।
নতুন বিধিমালায় চেয়ারম্যান পদের জন্য ২০টি, সাধারণ সদস্য পদের জন্য ১২টি এবং সংরক্ষিত সদস্য পদের জন্য ১০টি প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান পদের প্রতীকের মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার, কলার ছড়ি, ঘণ্টা, ঘোড়া, চিংড়ি, জগ, টেবিল, টেবিলঘড়ি, টেলিফোন, দালান, দোতলা বাস, পাগড়ি, বেবিট্যাক্সি, ময়ূর, মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল, মোড়া, রেল ইঞ্জিন, সোফা ও হাঁস।
সংরক্ষিত সদস্য পদে আলমারি, কলস, ড্রেসিং টেবিল, পালকি, ফলের ঝুড়ি, মাইক, সেলাই মেশিন, সূর্যমুখী ফুল, হরিণ ও হেলিকপ্টার প্রতীক রাখা হয়েছে। সাধারণ সদস্য পদে উট, কাপ-পিরিচ, ঘুড়ি, জাহাজ, টর্চলাইট, টিউবওয়েল, ট্রাক্টর, তালা, ফুটবল, বৈদ্যুতিক পাখা, বৈদ্যুতিক বাল্ব ও মোরগ প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, চেয়ারম্যান প্রার্থী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। আগে এই সীমা ছিল ৫ লাখ টাকা। তবে সাধারণ সদস্য প্রার্থীদের সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ২ লাখ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রার্থী বা তাঁর নির্বাচনী এজেন্টকে নির্ধারিত ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করতে হবে। ২০ হাজার টাকার বেশি কোনো লেনদেন ব্যাংকিং মাধ্যম ছাড়া করা যাবে না।
প্রার্থীদের আর্থিক তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও নতুন বাধ্যবাধকতা যুক্ত হয়েছে। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থী এবং তাঁর ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের দেশে ও বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণ হলফনামার মাধ্যমে দিতে হবে। একই সঙ্গে সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্রও জমা দিতে হবে।
নির্বাচনী অপরাধ ও বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তাঁর সমর্থক হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।
কোনো ভোটকেন্দ্রের ফলাফল বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি, কারসাজি বা অন্য কোনো অপকর্মের কারণে গুরুতরভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হলে কমিশন ওই কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করতে পারবে। অনুসন্ধানের পর প্রয়োজন মনে করলে ওই কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোট গ্রহণের নির্দেশও দিতে পারবে।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। কোনো উৎস থেকে পাওয়া রেকর্ড বা লিখিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো প্রার্থী বা তাঁর নির্বাচনী এজেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে কমিশন তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে লিখিত আদেশে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা যাবে। এ আদেশ প্রার্থী, তাঁর নির্বাচনী এজেন্ট ও রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানানো এবং সরকারি গেজেটে প্রকাশ করার বিধান রাখা হয়েছে।
গণমাধ্যমকর্মীদের নির্বাচনী কাজে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ফলে ভোটকেন্দ্র ও নির্বাচনী কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিকদের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
প্রতিবন্ধী ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগ সহজ করতেও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও শারীরিকভাবে অক্ষম ভোটাররা প্রিসাইডিং কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে ভোটদানের জন্য অন্তত ২১ বছর বয়সী একজন সহায়তাকারী সঙ্গে নিতে পারবেন। তবে কোনো প্রার্থী, প্রার্থীর এজেন্ট, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ওই সহায়তাকারী হতে পারবেন না। সহায়তাকারীকে ভোটারের ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে এবং এ ধরনের ভোটারের জন্য প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে পৃথক তালিকাও সংরক্ষণ করতে হবে।
সংশোধিত বিধিমালায় জামানত, নির্বাচনী ব্যয়, প্রতীক, সম্পদের তথ্য, নির্বাচনী অপরাধ, সমান ভোট এবং প্রতিবন্ধী ভোটারদের সহায়তাসহ ইউপি নির্বাচন পরিচালনার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগের তুলনায় ভিন্ন বিধি ও কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার পথ তৈরি হলো।










