মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রভাব পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘিরে হামলা ও হুমকি, ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে আঞ্চলিক সংকট আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। রয়টার্স ও আল-জাজিরার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংঘাতের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর এডেনে আল-মাশিক প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ চত্বরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পাঁচজন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন বলে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সরকারি বাহিনী ও সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কমান্ড সেন্টার। হুতিরা সৌদি সামরিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। তবে হামলার লক্ষ্যবস্তু ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করা যায়নি। দেশটির প্রধানমন্ত্রীসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অক্ষত রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
এ ঘটনার পাশাপাশি সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, চলতি মাসে রিয়াদের বিমানবন্দরকে একাধিকবার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। হুতিরাও সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রাখার হুমকি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরব ও হুতিদের বিরোধের পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখলের পর সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সহায়তা দিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট দেশটিতে হস্তক্ষেপ করে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সংঘাত কিছুটা কমলেও ২০২৬ সালে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা দেশটির অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশে চাপ তৈরির কৌশল হতে পারে। সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার আওতায় পর্যটন, পরিবহন, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ খাতে বড় ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলার ঝুঁকি বাড়লে নিরাপত্তা ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার কারণে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে হুতিদের সব কর্মকাণ্ডকে কেবল ইরানের আঞ্চলিক কৌশল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সৌদি সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা এবং নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার প্রচেষ্টাও সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি ১৫ অক্টোবর অভিযোগ করেন, ইরান হুতিদের হামলা বাড়াতে উৎসাহ দিচ্ছে। সৌদি কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের সহায়তায় হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা বেড়েছে। তবে তেহরান অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। প্রতিটি হামলার ক্ষেত্রে ইরানের সরাসরি নির্দেশের প্রমাণও প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে ইরানের সহায়তার অভিযোগ, হুতিদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বাস্তবতা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংঘাতকে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে ঠেকানো। পাল্টা সামরিক অভিযান বাড়ালে হুতিদের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এতে ইয়েমেনে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি বৃদ্ধির ঝুঁকিও রয়েছে।
পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী। ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাতের কারণে এ পথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ অঞ্চলে জাহাজে হামলা ও হামলার চেষ্টার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টারও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার একাধিক খবর দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে জাহাজের বিমা, পরিবহন এবং পণ্য সরবরাহের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার বড় অর্থনীতির পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোও এর প্রভাব অনুভব করতে পারে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরের গুরুত্ব বাড়ছে। দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের উপকূলে ইয়ানবু পর্যন্ত বিস্তৃত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে তেল রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। তবে বিকল্প পথে সরবরাহ চালু থাকলেও পাইপলাইন, পাম্পিং স্টেশন, শোধনাগার, বন্দর ও জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদারে ফ্রান্সের সামরিক সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র পাসকাল কনফেরাঁ জানান, সৌদি জ্বালানি স্থাপনা সুরক্ষায় দুই দেশের সমঝোতা বাস্তবায়নে কাজ চলছে। এর আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইয়ানবু অঞ্চলের নিরাপত্তায় সেনাসদস্য, রাডার ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন।
তবে কী পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে এবং সেগুলোর কার্যকারিতা কতটা, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফ্রান্সের এ সহযোগিতা সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে সৌদি নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে রিয়াদ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে।
ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তায়েজ নতুন করে সংঘর্ষের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে লড়াইয়ের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে তায়েজ প্রদেশে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও বাড়ছে।
তায়েজের গুরুত্ব শুধু সামরিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শহরটি এডেন ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথের কাছাকাছি। সেখানে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়লে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালী লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য এ নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবেও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বিশ্ববাণিজ্য দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়তে পারে। জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প পথে চলাচল করতে হলে সময়, জ্বালানি ও বিমা ব্যয় বাড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের যাতায়াত, কর্মস্থলের নিরাপত্তা ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
জাহাজ চলাচলের ব্যয় বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি এবং পণ্য সরবরাহব্যবস্থাও প্রভাবিত হতে পারে। তবে এ প্রভাব কতটা গুরুতর হবে, তা নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্ব, জ্বালানি সরবরাহের পরিস্থিতি এবং বিকল্প পরিবহনপথের কার্যকারিতার ওপর। শুধু হামলার খবরের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জ্বালানির দাম বা প্রবাসী আয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয় এবং হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—উভয় নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা কত দ্রুত নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।
সামরিক অভিযান ও পাল্টা হামলা বাড়তে থাকলে ইয়েমেনের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আরও জটিল হতে পারে। অন্যদিকে কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে হামলা বন্ধ, নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা গেলে সংঘাতের বিস্তার সীমিত রাখার সুযোগ থাকবে।
হরমুজ থেকে বাব আল-মান্দেব পর্যন্ত বিস্তৃত এই সংকটে তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির স্বার্থও জড়িয়ে রয়েছে।












