লালনসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ও ‘লালনসম্রাজ্ঞী’খ্যাত ফরিদা পারভীনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১৩ সেপ্টেম্বর। দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভোগার পর ২০২৫ সালের এই দিনে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বরেণ্য এই শিল্পী। মৃত্যুর এক বছর পরও তার কণ্ঠের গান, সংগীতসাধনা এবং লালন সাঁইয়ের দর্শনের প্রতি নিবেদন শ্রোতাদের মনে অমলিন হয়ে আছে।
ফরিদা পারভীন শুধু একজন সংগীতশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন লালনগীতি ও বাঙালির লোকজ দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রচারক। তার কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গান দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়। লালনের মানবতাবাদ, জীবনবোধ ও দর্শনকে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অনন্য।
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদা পারভীন। তার শৈশব ও বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়ায়। ছোটবেলায় মাগুরায় ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে সংগীতে হাতেখড়ি হয় তার। ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে নজরুলসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তার সংগীতজীবনের সূচনা। পরে দেশাত্মবোধক গানেও পরিচিতি পান তিনি।
পরবর্তী সময়ে সাধক মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে লালনসংগীতে তালিম নেন ফরিদা পারভীন। লালনের গানই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে তার সংগীতসাধনার প্রধান ক্ষেত্র। তার নিজস্ব পরিবেশনশৈলী ও দরদী কণ্ঠ লালনগীতিকে নতুন প্রজন্মসহ দেশ-বিদেশের শ্রোতার কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।
সংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন ফরিদা পারভীন। ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রের ‘নিন্দার কাঁটা’ গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা নারী কণ্ঠশিল্পীর সম্মান পান। ২০০৮ সালে জাপানের ফুকুওকা এশিয়ান কালচার পুরস্কারও অর্জন করেন তিনি।
শুধু গান পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না ফরিদা পারভীন। নতুন প্রজন্মের মধ্যে লোকসংগীত ও লালনগীতি ছড়িয়ে দিতে তিনি ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন। সংগীতশিক্ষার মাধ্যমে তার সাধনা ও দর্শনের উত্তরাধিকার ধরে রাখার কাজ এখনো চলছে।
ফরিদা পারভীনের সঙ্গে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্ক ছিল বরেণ্য সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের। তাদের সম্পর্ক ছিল বড় বোন ও ছোট বোনের মতো। ফেরদৌসী রহমানের স্মৃতিচারণে, ফরিদা পারভীনের গান শুনলে মনে হতো তিনি শুধু গান গাইছেন না, বরং প্রতিটি কথা ও তার অন্তর্নিহিত ভাব গভীরভাবে অনুভব করেই তা পরিবেশন করছেন।
মৃত্যুর পর ফরিদা পারভীনকে কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে তার মা-বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাকে স্মরণ করে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, বাংলাদেশ বেতার ও সংগীত প্রতিষ্ঠান বিশেষ আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ বেতারে আজ তাকে নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যমে তার জীবন, সংগীতসাধনা ও লালনসংগীতে অবদান নিয়ে স্মরণ আয়োজন করা হচ্ছে।
ফরিদা পারভীনের মৃত্যুর এক বছর পরও তার গাওয়া গান নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে ফিরে আসছে। লালনের বাণী, তার শেখানো সুর এবং সংগীতসাধনার উত্তরাধিকার শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে এগিয়ে চলেছে। তাই তার কণ্ঠ থেমে গেলেও লালনগীতির জগতে তার রেখে যাওয়া সুর ও সাধনার পথ আজও জীবন্ত।












