ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ অংশ নিয়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার ঘটনা তদন্তে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। দেশটির সাধারণ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে শনিবার রাতে অনুষ্ঠিত এ বিক্ষোভে সরকারের নিরাপত্তাব্যবস্থা, হামলার আগে গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং পরবর্তী পদক্ষেপের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে এই বিক্ষোভ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। আয়োজকদের দাবি, সমাবেশে এক লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
‘অক্টোবর কাউন্সিল’ নামের একটি সংগঠন এ বিক্ষোভের আয়োজন করে। সংগঠনটিতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি, সাবেক জিম্মি এবং নিহতদের স্বজনেরা রয়েছেন। তেল আবিবের হোস্টেজেস স্কয়ারে আয়োজিত সমাবেশে তারা হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং সরকারের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আহ্বান জানান।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে হামলায় নিহত জিম্মি ওরি দানিনোর বাবা এলহানান দানিনো সরকারের বিরুদ্ধে তদন্ত এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, সরকার স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করছে না, কারণ কর্তৃপক্ষের হয়তো কিছু গোপন করার রয়েছে। হামলার প্রায় তিন বছর হতে চললেও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় তদন্ত শুরু না হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
আরেক জিম্মির মা ভিকি কোহেন বলেন, ৭ অক্টোবর কী ঘটেছিল, সেই সত্য কোনোভাবেই চাপা পড়তে দেওয়া যাবে না। নিরাপত্তা বিভাগের ব্যর্থতার সঙ্গে জড়িত শীর্ষ কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে সরে গেছেন উল্লেখ করে তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও দায় স্বীকার করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে নিহত ও অপহৃত ব্যক্তিদের পরিবারের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও জবাবদিহির দাবি উঠে আসে।
বিক্ষোভে নেতানিয়াহুর বিরোধী রাজনৈতিক জোটের কয়েকজন শীর্ষ নেতাও অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট, ডেমোক্র্যাটস পার্টির ইয়ার গোলান, ইসরায়েল বেইতেনুর আভিগদর লিবারম্যান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ। সমাবেশে বিরোধী নেতারা ৭ অক্টোবরের হামলার বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং নিহতদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
ইয়ার গোলান বলেন, নির্বাচনের পর বুধবার থেকেই সত্য উদ্ঘাটন এবং নিহতদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনের পর বিষয়টি বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর অন্যতম অগ্রাধিকার হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ইসরায়েলে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন বড় ধরনের জাতীয় বিপর্যয় বা গুরুতর ঘটনার তদন্তে ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সংস্থা। এ ধরনের কমিশন সাক্ষীদের তলব করতে পারে এবং তদন্তের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বিষয়ে সুপারিশ দিতে পারে। ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থায় কী ধরনের ঘাটতি ছিল এবং হামলার পর সরকারের প্রতিক্রিয়া কতটা কার্যকর ছিল, তা খতিয়ে দেখার জন্য এমন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা।
তবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনে সম্মত হননি। তাঁর যুক্তি, সুপ্রিম কোর্টের নিয়োগ দেওয়া কমিশন সরকারের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। এই অবস্থানের কারণে তদন্ত কমিশনের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
সমাবেশে বক্তব্য দেন সাবেক জিম্মি ড্যানিয়েল আলোনিও। তিনি বলেন, ওই দিন শুধু মানুষকে অপহরণ করা হয়নি, মানুষের নিরাপত্তাবোধও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আসন্ন নির্বাচনের পর শিশুদের জন্য ভিন্ন ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে এবং বহু মানুষকে জিম্মি করা হয়। এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়, যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও ব্যাপক মানবিক সংকট তৈরি হয়। হামলার আগে ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কী ধরনের ব্যর্থতা ছিল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।
নির্বাচনের ঠিক আগে তেল আবিবের এই বিক্ষোভে তাই শুধু তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি নয়, সরকারের জবাবদিহি ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্নও সামনে এসেছে। নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তদন্তের দাবি কীভাবে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।