সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করতে গিয়ে বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। আঞ্চলিক সংঘাত ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে প্রচলিত সমুদ্রপথ এড়িয়ে দীর্ঘ বিকল্প রুটে তেল পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা মূল্যের এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল চট্টগ্রামে আনতে শুধু পরিবহন খরচই পড়ছে প্রায় ২১৭ কোটি টাকা। ফলে তেল ও পরিবহন মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।
সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে আগে লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালি হয়ে তুলনামূলক সরাসরি রুট ব্যবহার করা হতো। এ পথে সৌদি আরবের ইয়ানবু থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে সাধারণত ১৩ থেকে ১৫ দিনের মতো সময় লাগত। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের সাম্প্রতিক পরিবহন দরপত্রেও সৌদি আরবের ইয়ানবু ও রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রামে এক লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড পরিবহনের তথ্য রয়েছে।
কিন্তু বাব এল-মান্দেব ঘিরে নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় জাহাজকে এখন দীর্ঘ বিকল্প পথে চলতে হচ্ছে। একটি সাম্প্রতিক চালানে জাহাজটি সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর ও জিব্রাল্টার প্রণালি পেরিয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ ঘুরে ভারত মহাসাগর হয়ে বাংলাদেশে এসেছে। এতে সমুদ্রযাত্রার সময় প্রায় ৫০ দিনে পৌঁছেছে।
দীর্ঘ এই রুটে জাহাজকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় সমুদ্রে থাকতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানি, জাহাজ পরিচালনা, ক্রু, রক্ষণাবেক্ষণ, বীমা এবং ভাড়াসহ পরিবহনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, বিকল্প রুট ব্যবহারের কারণে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিবহনে অতিরিক্ত কয়েক মিলিয়ন ডলারের ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। এর একটি চালানে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় প্রায় ৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার বা ৬৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা হিসাব করা হয়েছিল।
তেলের পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে শুধু রুট পরিবর্তনই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখছে। হরমুজ প্রণালির সংকটের পাশাপাশি বাব এল-মান্দেব ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তাঝুঁকি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবও বিকল্প পথে এশীয় ক্রেতাদের কাছে অপরিশোধিত তেল সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় অপরিশোধিত তেল আমদানির ভূমিকা রয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় আমদানি করা তেল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের পর বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য হিসেবে বাজারজাত করা হয়। ফলে অপরিশোধিত তেলের আমদানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে তা পুরো জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির সম্ভাবনাও যাচাই করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে নতুন উৎস বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ক্রয়মূল্য কম কি না, তা দেখলেই হবে না। তেলের মান, ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের উপযোগিতা, উৎপাদন সক্ষমতা, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং নিরাপদ সমুদ্রপথ—সব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
দীর্ঘ সময় ধরে পরিবহন ব্যয় বাড়তি থাকলে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজন বাড়লে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানির সরবরাহ ব্যয় বাড়লে পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনের খরচের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিতেও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক তেলের দাম, বিনিময় হার, সরকারি মূল্য নির্ধারণ নীতি এবং দীর্ঘ রুটে কতদিন তেল পরিবহন করতে হচ্ছে—এসব বিষয়ের ওপর।
ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু অপরিশোধিত তেল কেনার দাম নয়, নিরাপদ ও কম ব্যয়ের পরিবহনব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করা এবং নিরাপদ সমুদ্রপথ নিশ্চিত করা গেলে আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।












