মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে ওয়াশিংটনের এই আশ্বাসে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না তেহরান। সম্ভাব্য নতুন সংঘাত মোকাবিলায় সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে ইরান। অন্যদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত, জ্বালানি স্থাপনা এবং সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন অভিযানের বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করছে পেন্টাগন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত একটি সামরিক অভিযানের মেয়াদ হতে পারে তিন দিন।
আল জাজিরা ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা চললেও যুদ্ধের অবসান নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। ফলে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণায় আপাতত হামলার আশঙ্কা কমার ইঙ্গিত মিললেও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ৯ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তুত করেছে পেন্টাগন। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত, জ্বালানি স্থাপনা এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও কমান্ডকেন্দ্র।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এ বিষয়ে আলোচনা করেন। প্রস্তাবিত পরিকল্পনার একটি বিকল্প হলো প্রায় তিন দিন ধরে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র সামরিক অভিযান চালানো। তবে এটি এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। অভিযান শুরুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাবে না। একই সঙ্গে তিনি দুই পক্ষের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে বলে দাবি করেন। তবে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সামরিক পরিকল্পনা তৈরির খবর নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইরানের সংবাদপত্র আল-ওয়েফাকের প্রধান সম্পাদক মোখতার হাদ্দাদ আল জাজিরাকে বলেছেন, ট্রাম্পের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে নিজেদের নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজাচ্ছে না তেহরান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শহরে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পরীক্ষা ও সামরিক মহড়া সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় ইরানের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। তবে এগুলো তাঁর মূল্যায়ন; ইরানের সামরিক প্রস্তুতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও জ্বালানির সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া, মার্কিন নৌঅবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং জব্দ করা সম্পদ ছাড়ের মতো বিষয় নিয়ে প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাবের আলোচনা হয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিরোধের প্রধান বিষয়গুলো একসঙ্গে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। দুই পক্ষের এই মতপার্থক্য সমঝোতার পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না-ও থাকতে পারে। ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, পাল্টা আক্রমণ কিংবা হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ ও নিত্যপণ্যের দামের ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের আগে হামলা না চালানোর বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণা এবং পেন্টাগনের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা—দুটি বিষয়ই পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা তুলে ধরছে। ইরানের অবিশ্বাস, হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিরোধ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য দূর না হলে সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যাবে। তবে সামরিক প্রস্তুতি নেওয়া মানেই হামলা অবধারিত নয়; শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির গতিপথ নির্ভর করবে দুই পক্ষের সামরিক সিদ্ধান্ত ও কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর।












