আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় দুর্নীতি, বেকারত্ব ও শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থার প্রতিবাদে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস, জলকামান ও রবার বুলেট ব্যবহার করে দাঙ্গা পুলিশ। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাথর নিক্ষেপ করে এবং সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর চালায়। একপর্যায়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রধান ফটকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি, উচ্চ বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে অসন্তোষ এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে এই আন্দোলন গড়ে উঠেছে। চলতি মাসে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ধীরে ধীরে রাজধানীর গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী এডি রামার পদত্যাগ।
শনিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার দিকে বিক্ষোভকারীরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে তাঁদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া দেয় এবং রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও গলিতে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
সংঘর্ষের মধ্যে বিক্ষোভকারীদের একাংশ সরকারি ভবন, ব্যাংক ও দোকানপাটে হামলা চালায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থাপনার জানালার কাচ ভাঙচুর করা হয় এবং রাস্তা থেকে ইট-পাথর তুলে পুলিশের দিকে ছোড়া হয়। অন্যদিকে, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাস, জলকামান ও রবার বুলেট ব্যবহার করে। তবে সংঘর্ষে হতাহতের সংখ্যা কিংবা আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে সরবরাহ করা প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী এডি রামা। ২০১৩ সাল থেকে দেশটির ক্ষমতায় থাকা এই নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও বিভিন্ন কেলেঙ্কারি নিয়ে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমে গেছে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন প্রয়োজন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২৮ বছর বয়সী ড্যানিয়েল তাহিরি বলেন, আলবেনিয়ার মানুষ অবশেষে জেগে উঠেছে। তাঁর ভাষায়, বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের আবরণে স্বৈরাচারী শাসন চালাচ্ছে। তবে এটি আন্দোলনকারীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মূল্যায়ন; সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কী বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা সরবরাহ করা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
২৯ বছর বয়সী আরেক আন্দোলনকারী অর্গেটা লিকাজ বলেন, দুর্নীতি ও একের পর এক কেলেঙ্কারির কারণে দেশের সাধারণ মানুষ এডি রামাকে আর ক্ষমতায় দেখতে চান না। সরকারের বিরুদ্ধে নিজেদের অসন্তোষ জানাতেই তাঁরা রাজপথে নেমেছেন বলে জানান তিনি।
এই বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে আরও কিছুদিন ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত গ্রীষ্মে আলবেনিয়ার উপকূলীয় এলাকায় একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের অর্থায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই প্রকল্পকে ঘিরে প্রতিবাদও বর্তমান আন্দোলনের পটভূমির অংশ। প্রকল্পটির বিরোধিতা থেকে শুরু হওয়া অসন্তোষের সঙ্গে পরে দুর্নীতি, বেকারত্ব ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ যুক্ত হয়।
প্রধানমন্ত্রী এডি রামা গত বছর চতুর্থ মেয়াদে জয়ী হন। ফলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপর কী ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
আলবেনিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি দেশটির শাসনব্যবস্থা, সরকারি জবাবদিহি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগকে সামনে এনেছে। বিক্ষোভকারীরা যেখানে সরকারের পদত্যাগ ও পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন, সেখানে সংঘর্ষ ও সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্দোলনের বিস্তার, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের উদ্যোগ—এসবের ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স।