শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য নতুন আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত আচরণবিধিতে শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয়তা, নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং শিক্ষাবহির্ভূত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারের নির্দেশনার পর এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য আচরণবিধির খসড়া তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। বিদ্যমান একটি খসড়া পর্যালোচনা ও পরিমার্জনের পর তা চূড়ান্ত বিধিমালায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে এখনো কোন কোন কর্মকাণ্ড সরাসরি নিষিদ্ধ হবে, তা চূড়ান্ত হয়নি।
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মপরিকল্পনায় শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোকে অন্যতম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, পাঠদান তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়েও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত আচরণবিধিতে শিক্ষকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কর্মকাণ্ড এবং চাকরিতে বহাল থাকা অবস্থায় একজন শিক্ষক পেশাগত পরিচয়ের বাইরে কী ধরনের কাজে যুক্ত হতে পারবেন, সে বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক পদ-পদবি ধারণ, দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ কিংবা শিক্ষকতার প্রভাব ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীতে শিক্ষকদের একটি অংশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ওপর মনোযোগ এবং পেশাগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আচরণবিধিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজনীতির পাশাপাশি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। কোনো শিক্ষক দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত না থেকেও স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হলে তার পেশাগত অবস্থানের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেটিও খসড়া প্রণয়নের সময় বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত বিধিমালা প্রকাশের আগে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়েছে বলা যাচ্ছে না।
শিক্ষকদের শিক্ষাবহির্ভূত পেশা ও কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও প্রস্তাবিত বিধিতে গুরুত্ব পাচ্ছে। শিক্ষকতার পাশাপাশি এমন কোনো ব্যবসা, পেশা বা কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা, যা নিয়মিত পাঠদান বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে, সেটির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে শিক্ষার মানোন্নয়নে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের ওপরও নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশব্যাপী অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভরভাবে পাঠদান পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, বিশেষ করে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেছেন, শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকদের এআই প্রশিক্ষণ, অ্যাপভিত্তিক লাইভ মনিটরিং এবং জাতীয় শিক্ষা চ্যানেলের প্রস্তুতির কাজ এগিয়ে চলছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মপরিকল্পনায় শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ নয়, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা এবং তাদের সার্বিক বিকাশের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, চিত্রাঙ্কন ও বিভিন্ন অলিম্পিয়াডসহ সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক সংকট মোকাবিলা এবং প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন আচরণবিধি কার্যকর হলে শিক্ষকতার পেশাগত দায়িত্ব, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও শিক্ষাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি হতে পারে। তবে প্রস্তাবিত বিধিমালা এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় এর আওতায় ঠিক কোন কোন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ বা সীমিত হবে, তা চূড়ান্ত বিধি প্রকাশের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
শিক্ষকদের আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসন শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং এবং শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হিসেবে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষাঙ্গনে পেশাগত শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।












