জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) তৃতীয় রাউন্ডের তৃতীয় দিনটি ছিল ব্যাটারদের ব্যক্তিগত অর্জন, রেকর্ড এবং রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ভরপুর। রাজশাহীর নাঈম আহমেদ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়েছেন। অন্যদিকে খুলনার আজিজুল হাকিম চোট কাটিয়ে ব্যাট হাতে ফিরে খেলেছেন দুর্দান্ত শতক। দ্রুততম অর্ধশতকের রেকর্ড গড়েছেন বরিশালের জাওয়াদ আবরার। পাশাপাশি ঢাকার মোহাম্মদ নাঈম শেখ তুলে নিয়েছেন নিজের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরি।
সব মিলিয়ে জাতীয় লিগের তৃতীয় দিনের আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন তরুণ ব্যাটাররা। ব্যক্তিগত কীর্তির পাশাপাশি কয়েকটি ম্যাচে জমে উঠেছে দলীয় লড়াইও।
রাজশাহীতে নাঈম আহমেদের ব্যাটিং ছিল দিনের অন্যতম বড় আকর্ষণ। আগের দিন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নেওয়া ২১ বছর বয়সী এই ব্যাটার তৃতীয় দিন সকালে কামরুল ইসলাম রাব্বীর বলে বাউন্ডারি মেরে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের পঞ্চম ব্যাটার হিসেবে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিকেই দ্বিশতকে রূপ দেওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি।
নাঈমের ইনিংসটি ছিল ধৈর্য ও আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের অনন্য সমন্বয়। ২৬৭ বলে ২৬টি চার ও একটি ছক্কায় ২০২ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। তাঁর দুর্দান্ত ইনিংসের ওপর ভর করে ৭ উইকেটে ৪৫৭ রান তুলে প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে রাজশাহী।
জবাবে প্রথম ইনিংসে ২২৯ রান করা বরিশাল দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। দলের তরুণ ওপেনার জাওয়াদ আবরার শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে রাজশাহীর বোলারদের চাপে ফেলেন। মাত্র ২২ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটারদের মধ্যে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড গড়েন তিনি। এর আগে ২০১৪-১৫ মৌসুমে জাতীয় ক্রিকেট লিগে ২৪ বলে অর্ধশতক করেছিলেন জিয়াউর রহমান।
জাওয়াদের ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরির সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত ৯১ রানেই থামে তাঁর ইনিংস। ৯৪ বলে ৯টি চার ও ৪টি ছক্কায় সাজানো এই ইনিংসটি বরিশালকে লড়াইয়ে ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে বরিশালের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ২৪৯ রান। রাজশাহীর প্রথম ইনিংসের সংগ্রহের চেয়ে তারা ২১ রানে এগিয়ে রয়েছে।
সিলেটে খুলনা ও চট্টগ্রামের ম্যাচেও দেখা গেছে দুর্দান্ত ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স। খুলনার তরুণ ব্যাটার আজিজুল হাকিম প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজের পঞ্চম ম্যাচে এসে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন। চট্টগ্রামের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১৪২ রান।
আগের দিন চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল আজিজুলকে। তবে তৃতীয় দিন সকালে ব্যাট হাতে ফিরে তিনি দলকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করার পাশাপাশি বড় সংগ্রহ গড়ার ভিত তৈরি করেন। ১৪৭ বলে ৯টি চার ও ১০টি ছক্কায় সাজানো তাঁর ইনিংসে ছিল আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী ধৈর্য ধরে খেলার দৃষ্টান্ত।
আজিজুলের সবচেয়ে স্মরণীয় লড়াইটি ছিল শেষ উইকেটে। খুলনার ২৫৬ রানে নবম উইকেট পড়ার পর শেষ ব্যাটার সফর আলীকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তিনি। দশম উইকেটে দুজন মিলে যোগ করেন ৬৭ রান। সফর ২১ বল খেলেও কোনো রান করতে পারেননি। অন্য প্রান্তে আজিজুল একাই যোগ করেন ৬৫ রান।
৮৮ রানে থাকা অবস্থায় শরিফের বলে পরপর দুটি ছক্কা মেরে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন আজিজুল। এরপরও থেমে থাকেননি তিনি। আরও ৪২ রান যোগ করে খুলনার সংগ্রহ নিয়ে যান ৩২৩ রানে। শেষ পর্যন্ত মাহমুদুল হাসান জয়ের বলে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে আউট হন এই তরুণ ব্যাটার।
২৭৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চট্টগ্রাম শুরুতে ভালো অবস্থানে ছিল। উদ্বোধনী জুটিতে মাহমুদুল হাসান জয় ও সাদিকুর রহমান যোগ করেন ১৩০ রান। জয় করেন ৬০ রান, আর সাদিকুরের ব্যাট থেকে আসে ৭৬ রান। তবে শেষ ঘণ্টায় ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেন খুলনার বোলাররা।
কনকাশন বদলি হিসেবে খেলতে নামা বাঁহাতি স্পিনার রাকিব হাওলাদার একাই তুলে নেন চারটি উইকেট। মাত্র ২৫ রানের মধ্যে পাঁচ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে চট্টগ্রাম। তৃতীয় দিন শেষে তাদের সংগ্রহ ৫ উইকেটে ১৭৪ রান। শেষ দিনে জয়ের জন্য চট্টগ্রামের প্রয়োজন আরও ১০১ রান, আর খুলনার দরকার পাঁচ উইকেট।
চট্টগ্রামে রংপুরের বিপক্ষে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে সিলেট। প্রথম ইনিংসে ১৭৯ রান করা সিলেট দ্বিতীয় ইনিংসে তৃতীয় দিন শেষে ৮ উইকেটে ২৩৫ রান করেছে। তাদের মোট লিড দাঁড়িয়েছে ২০৮ রান। দলের হয়ে অপরাজিত ৯৪ রান করেছেন অমিত হাসান।
জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর ব্যাট হাতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন এই ব্যাটার। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ছয় রান দূরে থাকা অমিতের সামনে শেষ দিনে ব্যক্তিগত মাইলফলক স্পর্শ করার পাশাপাশি দলের লিড আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে কক্সবাজারে ময়মনসিংহ ও ঢাকার মধ্যকার ম্যাচটি ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছে। ময়মনসিংহের প্রথম ইনিংসে করা ৩৮৭ রানের জবাবে তৃতীয় দিন শেষে ঢাকা ৯ উইকেটে ৩৪২ রান করেছে। দলের অধিনায়ক মোহাম্মদ নাঈম শেখ খেলেছেন ১৩৫ রানের ইনিংস। ২১৩ বলে ১৩টি চার ও তিনটি ছক্কায় সাজানো এই ইনিংসটি তাঁর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরি।
তবে সেঞ্চুরির খুব কাছে গিয়েও হতাশ হতে হয়েছে তাইবুর রহমানকে। ১৪৮ বলে ৯৩ রান করে আউট হন তিনি। তাঁর ইনিংসটি ঢাকার সংগ্রহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও শতক থেকে মাত্র সাত রান দূরে থেমে যায় ব্যক্তিগত অর্জনের স্বপ্ন।
জাতীয় ক্রিকেট লিগের তৃতীয় রাউন্ডের তৃতীয় দিনটি তাই ব্যক্তিগত রেকর্ড ও দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিক থেকে ছিল উল্লেখযোগ্য। নাঈম আহমেদের প্রথম সেঞ্চুরিতেই ডাবল সেঞ্চুরি, আজিজুল হাকিমের শেষ উইকেটে অবিশ্বাস্য লড়াই, জাওয়াদ আবরারের দ্রুততম ফিফটি এবং মোহাম্মদ নাঈম শেখের শতক—সব মিলিয়ে দিনটি রাঙিয়েছেন ব্যাটাররা।
এখন শেষ দিনের অপেক্ষা। ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকার ম্যাচগুলোর ফল কোন দিকে যায়, সেটিই হবে জাতীয় ক্রিকেট লিগের তৃতীয় রাউন্ডের অন্যতম আকর্ষণ।