দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সামগ্রিক মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে বলে আমদানিকারক ও অপারেটররা সরকারকে আশ্বস্ত করলেও খুচরা বাজারে দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও একটি সিলিন্ডারের জন্য গ্রাহকদের ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। অথচ সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে জাতীয় পর্যায়ে আমদানি ও মজুতের পরিসংখ্যান এবং স্থানীয় বাজারে সরবরাহ—দুটি ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ২২ দিনে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এলপিজি অপারেটররা জানান, দেশে বর্তমানে এলপিজির কোনো সামগ্রিক সংকট নেই। আমদানি, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তারা বাজারের সামগ্রিক সরবরাহকে সন্তোষজনক বলে দাবি করেন। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন।
তবে খুচরা বাজারে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে ভোক্তাদের অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, তাদের কথা বলা অন্তত ১০ জন গ্রাহক ১২ কেজির সিলিন্ডারের জন্য প্রায় ২ হাজার টাকা বা তার বেশি দিয়েছেন। কেউ কেউ ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন, যা বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬১৫ টাকা বেশি।
এলপিজির সেপ্টেম্বরের মূল্য নির্ধারণের সময় বিইআরসি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে। ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এই মূল্য নির্ধারণে সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস, পরিবহন ব্যয়, ব্যবসায়ীদের প্রিমিয়াম এবং বিনিময় হার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতির পেছনে আন্তর্জাতিক পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার চাপও রয়েছে। এলপিজি আমদানিকারকদের উদ্ধৃত করে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকি, জাহাজের সংকট এবং বাড়তি ফ্রেইট ব্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কার্গো সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব কারণ সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অন্যদিকে, এলপিজি অপারেটরদের পক্ষ থেকে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ২৯ সেপ্টেম্বর বলেন, দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবে কেউ মজুতদারি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করলে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখানে জাতীয় পর্যায়ের মজুত ও খুচরা পর্যায়ের সরবরাহের পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। দেশে মোট কত এলপিজি আমদানি হয়েছে বা কত মজুত আছে, সেটি এক ধরনের হিসাব। অন্যদিকে আমদানিকারক থেকে অপারেটর, ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে সিলিন্ডার সময়মতো গ্রাহকের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও বিতরণ ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা হলে নির্দিষ্ট এলাকায় সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, কিছু কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ করছে না। বিপরীতে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরবরাহ কমে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো ডিলার, পরিবেশক বা খুচরা বিক্রেতা সিলিন্ডার মজুত করে বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কোম্পানিভিত্তিক সরবরাহ, ডিলারদের কাছে পাঠানো সিলিন্ডারের পরিমাণ, খুচরা বিক্রির রসিদ ও মজুতের হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এদিকে শিল্প খাতেও এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। দেশে পাইপলাইনের গ্যাসের ঘাটতি ও নিম্নচাপের কারণে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন ইতোমধ্যে শিল্পে এলপিজিকে অন্তর্বর্তীকালীন বিকল্প জ্বালানি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামো ও আমদানি সহজ করার দাবি জানিয়েছে।
ফলে একদিকে সরকারের কাছে অপারেটরদের দেওয়া হিসাব বলছে দেশে সামগ্রিকভাবে এলপিজির মজুত সন্তোষজনক, অন্যদিকে ভোক্তারা নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। এই দুই বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানই বর্তমানে এলপিজির বাজারে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানি, মজুত, পরিবেশক পর্যায়ের বিতরণ এবং খুচরা বিক্রির তথ্য সমন্বিতভাবে নজরদারি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া বা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ সত্য হলে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।












