রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের নতুন করে হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনা করে তিনি হামলাটিকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্পের দাবি, রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে এবং এতে জ্বালানি সরবরাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ তুলে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
বৃহস্পতিবার সম্প্রচারিত নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট যে ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তাঁর ভাষায়, “সে যা করছে, তাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে। আমার মতে, এটি লজ্জাজনক।”
রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, অনেক ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো সম্ভব। কিন্তু যেসব শোধনাগারে ডিজেল উৎপাদন করা হয়, সেখানে হামলা চালানো হলে তা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ, ডিজেল যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও পরিবহনব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প একতরফাভাবে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের ঘোষণা দিলেও রাশিয়া ও ইউক্রেন—কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এ উদ্যোগে সম্মতির কথা জানায়নি। পরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, কিয়েভ এ উদ্যোগ থেকে সরে আসছে। এরপর রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে আবারও হামলা চালায় ইউক্রেন।
এর আগে বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে রাশিয়ার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে জেলেনস্কি এ পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সুযোগ পেতে পারে।
যুদ্ধ বন্ধে নিজের প্রচেষ্টা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি মনে করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও জেলেনস্কি—দুজনই যুদ্ধের অবসান চান। তবে পুতিনের তুলনায় জেলেনস্কির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো তাঁর কাছে বেশি কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি জেলেনস্কির খুব বড় ভক্ত নন।
এদিকে, শুক্রবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতে ব্রাসেলসে পৌঁছান জেলেনস্কি। ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যের বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে ইউরোপীয় নেতাদের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁদের ‘প্রকৃত নেতা’ বলে অভিহিত করেন। জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধের অবসান চায়। কিন্তু রাশিয়ার পক্ষ থেকে যুদ্ধ বন্ধে প্রস্তুতির কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কেও নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের দাবি, স্টারলিংক স্যাটেলাইট যোগাযোগসেবা সীমিত হওয়ার কারণে তাদের ড্রোন হামলা পরিচালনা এবং গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। তবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বৃহস্পতিবার জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তাঁকে সরাসরি বৈঠকে আশ্বস্ত করেছেন যে গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থাটি পুনরায় চালু হয়েছে।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্ট্রিটিং বলেন, যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে মতবিরোধের ঘটনা নতুন নয়। যুদ্ধ পরিচালনা, সামরিক সহায়তা এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্য নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা বলেন, যুদ্ধের সময় ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ অর্জনের পথেও দেশটি সমর্থন পাবে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন বলেন, ইইউ ট্রাম্পের ঘোষিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতির উদ্যোগকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, রাশিয়া যুদ্ধবিরতি মেনে চলেনি; বরং হামলা আরও বাড়িয়েছে। রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে তিনি জানান, দেশটির বিরুদ্ধে ২২তম দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ না করা পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে না।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ফ্রান্স ও লুক্সেমবার্গের অনুরোধে রাশিয়ার দুই প্রভাবশালী ধনকুবেরের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এ সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নতুন নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা ইউরোপের রাশিয়াবিষয়ক নীতিতে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের ধারাবাহিকতা নিয়ে আলোচনা সামনে এনেছে।
জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেন, ইউক্রেনের আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, ইউক্রেনীয় জনগণ ও প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি একা নন।
ব্রাসেলসে মাখোঁর সঙ্গে বৈঠকের সময় জেলেনস্কি জানান, রাশিয়া ইউক্রেনের লুৎস্ক শহরের জ্বালানি অবকাঠামোয় নতুন করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। অন্যদিকে, রাশিয়ার ক্রেমলিন অভিযোগ করেছে, তেল শোধনাগারে হামলা পুনরায় শুরু করে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সব মিলিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, সামরিক সহায়তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্কের টানাপোড়েন—সবকিছু মিলিয়ে সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হচ্ছে। তবে যুদ্ধবিরতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।












