পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারে দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার কারণে বাড়তি সময় ও ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের আকাশসীমা ব্যবহারের বিকল্প পথ খুঁজছে ভারত। এ লক্ষ্যে চীনের সঙ্গে হোতানভিত্তিক একটি সম্ভাব্য বিমানপথ চালুর বিষয়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী রাম মোহন নাইডু মঙ্গলবার জানান, পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় ভারত বিকল্প পথ খুঁজছে এবং চীনের হোতান রুট নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বলে তিনি জানান। তবে প্রস্তাবিত রুটটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত রুটটি পশ্চিম চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের হোতানের ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এই পথ চালু করা গেলে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং মধ্য এশিয়াগামী কিছু ফ্লাইটের জন্য পাকিস্তানের আকাশসীমা এড়িয়ে বর্তমানে ব্যবহৃত দীর্ঘ পথের বিকল্প তৈরি হতে পারে।
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে পাকিস্তানের আকাশসীমা ভারতীয় বিমান চলাচলের জন্য বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ভারতের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাগামী কিছু ফ্লাইটকে পাকিস্তানের পরিবর্তে আরব সাগরের ওপর দিয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে উড়োজাহাজের জ্বালানি খরচ, উড্ডয়ন সময় এবং ক্রু-সংক্রান্ত ব্যয় বেড়েছে।
পাকিস্তান সর্বশেষ গত ১৬ সেপ্টেম্বর নতুন নোটাম জারি করে ভারতীয় বিমান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ২৪ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। নোটামে বলা হয়েছে, ভারতীয় নিবন্ধিত উড়োজাহাজ এবং ভারতীয় এয়ারলাইনস বা অপারেটরদের মালিকানাধীন, পরিচালিত কিংবা লিজ নেওয়া বিমান পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না। নিষেধাজ্ঞার আওতায় সামরিক বিমানও রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞাটি পাকিস্তানের করাচি ও লাহোর—দুই ফ্লাইট ইনফরমেশন রিজিয়নের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ২০২৫ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার পর থেকে ইসলামাবাদ একাধিকবার নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়িয়েছে।
এই নিষেধাজ্ঞার আর্থিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। ডন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের আকাশসীমা এড়িয়ে চলার কারণে এয়ার ইন্ডিয়ার কিছু দীর্ঘপাল্লার ফ্লাইটে জ্বালানি ব্যয় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং যাত্রার সময় সর্বোচ্চ প্রায় তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়তে পারে। এয়ার ইন্ডিয়া আগে জানিয়েছিল, নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘস্থায়ী হলে তাদের বার্ষিক মুনাফায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ অবস্থায় চীনের শিনজিয়াংয়ের হোতান রুটকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে নয়াদিল্লি। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত করিডর চালু হলে বর্তমানে আরব সাগর ঘুরে যাওয়া কিছু ফ্লাইটের সময় ও জ্বালানি ব্যয় কমতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট রুট, কোন কোন ফ্লাইট এই পথ ব্যবহার করতে পারবে এবং চীন কী ধরনের আকাশসীমা অনুমতি দেবে—এসব বিষয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
ভারত-চীন সম্পর্কের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের মধ্যেই এই আলোচনা নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২০ সালের সীমান্ত উত্তেজনার পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক ও বিমান যোগাযোগ পুনরায় বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। সরাসরি ভারত-চীন ফ্লাইটও ধীরে ধীরে পুনরায় চালু হয়েছে।
তবে হোতান রুট চালুর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং সম্ভাব্য রুটের কারিগরি ও কূটনৈতিক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফলে এটি বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় বিমান চলাচলের জন্য নতুন বিকল্প তৈরি হতে পারে, কিন্তু কবে থেকে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট এই রুট ব্যবহার করবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত হওয়ায় ভারত এখন চীনের সঙ্গে বিমান চলাচলের নতুন করিডর তৈরির চেষ্টা করছে। হোতানভিত্তিক এই সম্ভাব্য রুট বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানকে এড়িয়ে পশ্চিমমুখী ভারতীয় ফ্লাইট পরিচালনায় সময় ও ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।












