২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থানা ও পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশের হিসাবে, লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ৩১০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২ লাখ ৫৭ হাজার ১১৩টি গোলাবারুদ এখনো বেহাত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, এসব অস্ত্রের একটি অংশ সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ‘গলাকাটা মোবারক’কে গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। অভিযান চালানোর সময় পুলিশের দিকে যে পিস্তল দিয়ে তিনি গুলি ছুড়েছিলেন, সেটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক দাবি করেছেন, অন্য এক সন্ত্রাসীর মাধ্যমে তিনি অস্ত্রটি পেয়েছিলেন। তবে তদন্তকারীদের সন্দেহ, অস্ত্র লুটের ঘটনায় তার সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, ৫ আগস্টের সহিংসতার সময় উত্তেজিত জনতার পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধী ও তাদের সহযোগীরাও থানা-ফাঁড়িতে হামলার সুযোগ নিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে। পরবর্তী সময়ে সরকারের আহ্বান ও পুরস্কার ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের কাছে থাকা অনেক অস্ত্র জমা পড়ে কিংবা পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়। তবে এখনো যেসব অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, সেগুলো অপরাধীদের হাতে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন পুলিশের ৪৬০টি স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়। এর মধ্যে ১১৪টি থানায় ভাঙচুর এবং ৫৬টি থানায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসব স্থাপনা থেকে বিভিন্ন ধরনের ৫ হাজার ৭৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ লাখ ৫২ হাজার গোলাবারুদ লুট হয়।
চলতি বছরের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত এসব লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ৪ হাজার ৪৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯৫টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে ১০৯টি চায়না রাইফেল, ৩০টি চায়না এসএমজি, তিনটি এলএমজি, ২০৩টি ৭.৬২ পয়েন্ট ২৫ মিমি পিস্তল, ৪৪৩টি ৯ পয়েন্ট ১৯ মিমি পিস্তল এবং ৩৮৪টি ১২ বোরের শটগান। এছাড়া ১২৮টি সিঙ্গেল শটের গ্যাস গান, সাতটি টিয়ার গ্যাস লঞ্চার, দুটি সিগন্যাল পিস্তল এবং ৩৩টি ৯ পয়েন্ট ১৯ মিমি এসএমজি/এসএমটির একটিও উদ্ধার করা যায়নি।
শুধু আগ্নেয়াস্ত্র নয়, বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও অন্যান্য সরঞ্জামও এখনো উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৮০০ রাউন্ড গুলি, ১১ হাজার ৩৯৮টি টিয়ার গ্যাস শেল, ২৯১টি টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড এবং ১ হাজার ১৬৮টি সাউন্ড গ্রেনেড।
লুট হওয়া এসব অস্ত্র ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করেছে সরকার। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে বিশেষ ইউনিট গঠন করে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
অস্ত্র উদ্ধারে তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কারের পরিমাণও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ভারী অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা, পিস্তল, রিভলবার বা শটগান উদ্ধারে তথ্য দিলে ৫০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য লুট হওয়া অস্ত্র ও সরঞ্জামের তথ্যের ক্ষেত্রে শ্রেণিভেদে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, শুধু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট লুট হওয়া অস্ত্র নয়, এর আগে দেওয়া অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের পর যেসব অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি, সেগুলো উদ্ধারের অভিযানও চলছে।
সব মিলিয়ে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এসব অস্ত্র অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছে থাকলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।












