মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন একটি সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুই দেশের কাছে প্রস্তাবটি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ আরবের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উদ্যোগটিকে এমন একটি মধ্যপন্থি সমাধানের চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার মাধ্যমে দুই দেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি আংশিকভাবে পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।
প্রস্তাবটির কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ এবং জব্দ করা অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে তেহরানের দাবি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে ইরান চায়, বিদেশে আটকে থাকা দেশটির অর্থ ছাড় করা হোক। নতুন প্রস্তাবে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে সমঝোতার পথ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্য নিউ আরবের বরাতে জানা গেছে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির মঙ্গলবার ইরানের রাজধানী তেহরানে গিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকের সময় তিনি ইরানের কাছে নতুন প্রস্তাবটি তুলে ধরেন বলে সূত্রটির দাবি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবে ইরানকে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশটির পারমাণবিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এ পর্যবেক্ষণ গোপনে এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই পরিচালনার বিষয়টি প্রস্তাবে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিনিময়ে কাতারে জব্দ থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ৬ বিলিয়ন ডলারের অর্থের সুদ ইরানকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধ প্রশমনের একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রস্তাবটির শর্ত, পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি এবং অর্থ ছাড়ের বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের সম্মতি পাওয়া যাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এর আগে গত জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৬০ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে সমঝোতা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে দুই দেশের পূর্ণাঙ্গ চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নতুন করে জটিলতার মুখে পড়ে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জ্বালানিবাহী ট্যাংকারসহ বিভিন্ন জাহাজে ইরানের হামলা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিতিশীলতা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, তেলের বাজার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও বাস্তব পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছেন। দুই দেশই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রস্তাবের মাধ্যমে অন্তত আলোচনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধের সমাধান শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি বা জব্দ অর্থের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামরিক উপস্থিতি, পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধও সমঝোতার পথে বড় বাধা। ফলে নতুন প্রস্তাব কার্যকর করতে হলে দুই পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গ্রহণযোগ্য শর্ত এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক আলোচনা প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে পাকিস্তান ও কাতারের এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটি গ্রহণ করবে কি না, কিংবা এর ভিত্তিতে নতুন কোনো আলোচনা শুরু হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। দুই দেশের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই উদ্যোগ সংঘাত এড়ানোর ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হতে পারে।