ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ ও সহিংসতা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিদেশি নেতাদের মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে কিছু নেতা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
কাতার সফরকালে মাখোঁ বলেন, গত শনিবারের দাঙ্গার পর ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহল তথ্যের অপব্যবহার করেছে। বিদেশি নেতাদের এমন কিছু মন্তব্যকে তিনি অগ্রহণযোগ্য ও বোকামিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে তিনি এসব কথা বলেছেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মাখোঁ বলেন, ‘অন্যদের মধ্যেও তিনি রয়েছেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের সহিংসতার জন্য অভিবাসী, জিহাদি ও কমিউনিস্টদের দায়ী করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাখোঁর অভিযোগ, নির্বাচনী প্রচারে থাকা কিছু নেতা ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন।
মাখোঁ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে, যেখানে ফ্রান্সে বাস্তবে ঘটেনি—এমন ঘটনাও দেখানো হচ্ছে। অভিবাসী ও ইসলামপন্থীদের বিশাল একটি গোষ্ঠী ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে—এমন দাবিকেও তিনি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে অভিহিত করেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ফ্রান্সে ‘চরমপন্থী ইসলামের আগ্রাসন’ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তবে ফ্রান্সের বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে অভিবাসীদের দায়ী করার বক্তব্য নাকচ করেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবার অবনতি নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংসতা ও লুটপাটে রূপ নেয়। প্যারিস, মার্সেই, লিওঁ ও লিমোজসহ বিভিন্ন শহরে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠে। লিমোজে নগর ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় ভবনটির একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত শনিবারের দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কথা সরকার স্বীকার করেছে। নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার প্যারিসের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সমাবেশ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয় পুলিশ।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় এলিসি প্রাসাদ, পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ, ল্যুভর জাদুঘর, শঁজেলিজে, বাস্তিল ও রিপাবলিক স্কয়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা রয়েছে। গত সপ্তাহে এসব এলাকার কয়েকটিতে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল।
নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে ফরাসি সরকার। মাখোঁ বলেছেন, আগামী শনিবার শহরের কেন্দ্রগুলোতে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা প্রতিরোধ করা হবে।
সরকারি কর্মকর্তারা অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি প্রয়োজনে সেনাসদস্য মোতায়েনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর আগে প্যারিস, মার্সেই ও লিলসহ কয়েকটি এলাকায় রাতে আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছিল। এসব পদক্ষেপের পর কিছু এলাকায় পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অস্থিরতার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে। বিদেশি পর্যটকদের জন্য কয়েকটি দেশ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। একই সঙ্গে ফ্রান্সের আর্থিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি পরিষেবার অবনতির প্রতিবাদে ২০১৮ সালে ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। এবার সেই আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত করতে কর্মীরা শনিবার প্যারিসের কেন্দ্র দিয়ে মিছিল করার পরিকল্পনা জমা দিয়েছেন।
একই দিনে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো। এ ছাড়া দেশটির প্রধান শ্রমিক ইউনিয়নগুলো আগামী ৫ নভেম্বর দেশজুড়ে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
সিজিটি শ্রমিক ইউনিয়নের প্রধান সোফি বলেন, মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। তাঁর মতে, এ পরিস্থিতির সমাধান কেবল দমন-পীড়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক উদ্যোগ।
এদিকে মাখোঁ জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্রান্সে জরুরি অবস্থা জারির প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, বিদ্যমান অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা দেশটির রয়েছে। বুধবার শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নুর বৈঠক হলেও সেখান থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি।
ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ বুধবার জানান, বিক্ষোভ চলাকালে ও পরে আটক হওয়া প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনের মধ্যে ১৭৪ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৯১৭ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ফ্রান্সের বাইরেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। ইতালি ও বেলজিয়ামেও বিভিন্ন সময়ে সহিংস বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে ইতালির সরকার মিলানে রাস্তায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৫০০ সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্রান্সের চলমান অস্থিরতা এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নির্বাচনী বক্তব্যেরও অংশ হয়ে উঠেছে। একদিকে সরকার বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করছে, অন্যদিকে বিক্ষোভের কারণ ও দায় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে।
মাখোঁর বক্তব্যে বিদেশি নেতাদের মন্তব্য এবং এআই-নির্মিত বিভ্রান্তিকর ছবি ছড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তবে ফ্রান্সের অস্থিরতা কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা নির্ভর করছে সরকারের পদক্ষেপ, আন্দোলনকারীদের প্রতিক্রিয়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত দাবিগুলোর বিষয়ে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর।