চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ করার চেষ্টা করলেও দেশটির ওপর ভারতের অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। বিশেষ করে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক উপাদান, রাসায়নিক ও সৌর সরঞ্জামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে চীনের ওপর নির্ভরতা থাকায় আমদানি কমানোর উদ্যোগে নতুন জটিলতা তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ভারতীয় শিল্পের এই নির্ভরতাকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর বিপরীতে ভারতের খেলনা শিল্পে স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি কমানোর একটি তুলনামূলক সফল উদাহরণ তৈরি হয়েছে। কয়েক বছর আগে দেশটির খেলনা আমদানির শুল্ক বাড়ানো এবং মাননিয়ন্ত্রণের বিধি কঠোর করার পর আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২০ সালে প্রায় ৩০ কোটি ডলারের খেলনা আমদানির বিপরীতে চলতি বছরে তা প্রায় ১০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে খেলনা রপ্তানি প্রায় ১২ কোটি ৯০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২০ কোটি ডলারে উঠেছে।
ভারত সরকার ২০২০ সালে খেলনা আমদানির শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে উন্নীত করে এবং পরে তা ৭০ শতাংশে নেয়। একই সঙ্গে আমদানি করা খেলনার মান নিয়ন্ত্রণেও কঠোরতা আরোপ করা হয়। সরকারি তথ্যেও দেখা যায়, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরের মধ্যে খেলনা আমদানি ৭০ শতাংশ কমে যায় এবং রপ্তানি ৬১ শতাংশ বাড়ে।
তবে খেলনা খাতের এই সাফল্য ভারতের বৃহত্তর শিল্প অর্থনীতিতে পুনরাবৃত্তি করা সহজ নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চীন ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়। ওই অর্থবছরে চীন থেকে ভারতের আমদানি দাঁড়ায় ১৩১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে চীনে ভারতের রপ্তানি ছিল ১৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড ১১২ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার এই চিত্র আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভারত ও চীনের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে। সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং বাণিজ্য ভারসাম্য, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারে প্রবেশের মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সমস্যার বড় জায়গা হলো, ভারত শুধু চীনা তৈরি পণ্য আমদানি করে না; নিজেদের উৎপাদন ব্যবস্থার জন্যও চীনা যন্ত্রাংশ ও উপকরণের ওপর অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরশীল। স্মার্টফোন, সৌর সরঞ্জাম, ব্যাটারি, শিল্পযন্ত্র, রাসায়নিক ও ইলেকট্রনিক উপাদানের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সরাসরি চীনা তৈরি পণ্যের আমদানি কমালেও একই উপকরণ অন্য কোনো দেশের মাধ্যমে আমদানি করলে প্রকৃত নির্ভরতা কমবে না।
ভারতে মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের স্থানীয় সংযোজন বা উৎপাদন বেড়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই উৎপাদনের বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর উপাদান ও যন্ত্রাংশের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে স্থানীয় উৎপাদন বাড়লেও সরবরাহশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে চীনা নির্ভরতা পুরোপুরি কমছে না।
চীনের বিপুল উৎপাদন সক্ষমতাও এই ভারসাম্যহীনতার আরেকটি কারণ। দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত উৎপাদনের একটি বড় অংশ বিদেশি বাজারে প্রবাহিত হচ্ছে। তুলনামূলক কম দামে ইস্পাত, সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক যানবাহনের যন্ত্রাংশ, শিল্প সরঞ্জাম ও অন্যান্য পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশ করছে। একই সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন শুল্ক ও বাণিজ্য বিধিনিষেধ চীনা রপ্তানিকারকদের বিকল্প বাজার খুঁজতে উৎসাহিত করছে।
ভারতের জন্য আরেকটি সমস্যা হলো চীনা বাজারে নিজস্ব পণ্যের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকা। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই শুল্ক, অশুল্ক বাধা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে চীনে রপ্তানি বাড়ানো কঠিন বলে অভিযোগ করে আসছেন। ফলে একদিকে চীনা পণ্যের আমদানি বাড়ছে, অন্যদিকে ভারতের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কমই থাকছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছে, শুধু আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। ভারতের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ শ্রমশক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন, অবকাঠামো, সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং শিল্পঋণের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে যেসব খাতে ভারত প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করতে পারে, সেসব খাতে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও ভারতের সামনে সুযোগ ও ঝুঁকি—দুইই রয়েছে। চীনা কোম্পানিকে ভারতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কর্মসংস্থান বাড়তে পারে। তবে এমন বিনিয়োগ যদি মূলত চীন থেকে যন্ত্রাংশ এনে ভারতে শুধু সংযোজনের ওপর নির্ভর করে, তাহলে আমদানিনির্ভরতা আরও গভীর হতে পারে। তাই প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় মূল্য সংযোজন ও দেশীয় উপাদান ব্যবহারের শর্তকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ওষুধশিল্পসহ কয়েকটি খাতে চীনে ভারতের রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। চীনের দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা জনসংখ্যা এবং বাড়তে থাকা স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ভারতীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন বাজার তৈরি করতে পারে। তবে ১১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য ঘাটতি শুধু কয়েকটি পণ্যের রপ্তানি বাড়িয়ে দ্রুত কমানো সম্ভব নয়—এ বিষয়ে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ভারত-চীন রাজনৈতিক সম্পর্কেও ধীরে ধীরে কিছুটা উষ্ণতা ফিরছে। তবে সীমান্ত বিরোধ, নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়লেও তা যেন একতরফা নির্ভরতায় পরিণত না হয়, সেটিই নয়াদিল্লির জন্য বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ।
ভারতের খেলনা শিল্প দেখিয়েছে, সঠিক নীতি, মান নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু খাতে চীনা আমদানি কমানো সম্ভব। কিন্তু শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে একই কৌশল প্রয়োগ করতে গেলে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, প্রযুক্তি সক্ষমতা ও সরবরাহব্যবস্থার বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন হবে। ফলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ভারতের জন্য শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি দেশটির শিল্পনীতির সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কৌশলেরও বড় পরীক্ষা।












