শিক্ষাখাতে অর্থায়ন, শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং শ্রেণিকক্ষের নানা সমস্যার প্রতিবাদে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। একই দিনে প্রায় ১ হাজার ৮০০ উচ্চবিদ্যালয় অবরোধ বা বন্ধ ছিল বলে শিক্ষার্থী সংগঠন জানিয়েছে।
মার্সেই, নাঁতেস, লিওঁ, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নামেন। অনেক স্থানে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ কিছু জায়গায় কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও সহায়ক কর্মী নেই। অনেক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, আবার বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাস চলা এবং দুপুরের খাবারের জন্য পর্যাপ্ত বিরতি না থাকার বিষয়েও তারা আপত্তি জানাচ্ছে।
আন্দোলনকারীদের হাতে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। সেগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো, শিক্ষক সংকট দূর করা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া এ আন্দোলন মঙ্গলবার সবচেয়ে বড় আকার নেয়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশজুড়ে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অন্যদিকে আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ।
আন্দোলনের মধ্যে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, আগুন জ্বালানো এবং পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছোড়ার ঘটনা ঘটে। সরকার পরিস্থিতিকে ক্রমেই ‘শহুরে সহিংসতা’র দিকে যাওয়ার বলে বর্ণনা করেছে।
এর আগে সোমবার উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে বিক্ষোভের সময় ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বিস্ফোরণে হাত হারায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই এলাকায় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ছিল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই কিশোর পুলিশের ব্যবহৃত একটি গ্রেনেড হাতে নেওয়ার পর সেটি বিস্ফোরিত হয়। তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত চলছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন। সরকার শিক্ষক সংকট, স্কুল ভবনের সংস্কার এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি হলো, অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বিকল্প শিক্ষক দিয়ে ক্লাস চালু করা এবং শিক্ষক সংকট কমানো। একই সঙ্গে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দীর্ঘ ক্লাসের সময় পর্যালোচনা, দুপুরের খাবারের জন্য বেশি সময় বরাদ্দ এবং পুরোনো স্কুল ভবন সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছে।
শিক্ষাখাতে সরকারের অর্থায়ন কমানোর পরিকল্পনা থেকেও সরে আসার দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের বক্তব্য, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া দেশের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার মান ও অবকাঠামো উন্নত করা সম্ভব নয়।
এদিকে আন্দোলন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং শত শত শিক্ষার্থী, স্কুলকর্মী ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু জানিয়েছেন, বিক্ষোভে অন্তত ২১৫ জন কিশোর এবং ৭১৫ জন পুলিশ বা জেন্ডারম সদস্য আহত হয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এখন শুধু স্কুল অবরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষক, অভিভাবক, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এটি বৃহত্তর জাতীয় আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের পাশাপাশি আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ফরাসি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।










