মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গত ছয় মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ও আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তবে জনগণের ওপর চাপ কম রাখতে সরকার এতদিন দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করেছে। এর ফলে বিপিসিকে গত প্রায় ছয় মাসে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি ফ্রেইট চার্জও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ছয় মাসে অতিরিক্ত ব্যয়ের মাসিক গড় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। বিপিসি চেয়ারম্যানের হিসাবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করা হলে সংস্থাটিকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হতো।
রফিকুল ইসলাম বলেন, শুধু জ্বালানি তেলের মূল্যের ক্ষেত্রেই নয়, পরিবহন ও হ্যান্ডলিং ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আগে যেখানে জাহাজের ফ্রেইট চার্জ প্রতি টনে প্রায় ৩ থেকে ৪ ডলার ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে ১৫ থেকে ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ জাহাজভাড়ার ব্যয় আগের তুলনায় প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে।
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের পরও বিপিসির ওপর লোকসানের চাপ পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিপিসি চেয়ারম্যানের হিসাবে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় ডিজেলে লিটারপ্রতি প্রায় ৭০ টাকা ঘাটতি রয়েছে এবং শুধু ডিজেল বিক্রিতেই দৈনিক প্রায় ১০৯ কোটি টাকা লোকসান হতে পারে। এ হিসাবে বছরে ডিজেল খাতেই লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
বিপিসি চেয়ারম্যান জানান, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা সমন্বয় করায় বছরে বিপিসির প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমানো সম্ভব হবে। সম্প্রতি সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। নতুন দামে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটার হয়েছে।
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সরবরাহে কোনো সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। একই সঙ্গে আমদানি কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
তবে জ্বালানি আমদানির অর্থায়ন নিয়ে বিপিসির ওপর চাপ রয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ থেকে আগস্টে আমদানি করা জ্বালানির এলসি নিষ্পত্তিতে বিপিসির ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে এবং সংস্থাটি এই অর্থ সরকারি ভর্তুকি হিসেবে ফেরত চেয়েছে। একই সময়ে জ্বালানি আমদানির অর্থ জোগাতে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাখা অর্থ থেকেও বিপিসিকে অর্থ নিতে হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি, ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধি এবং বিপিসির আর্থিক চাপের পাশাপাশি ভর্তুকির বোঝা ও সীমান্তপথে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কথাও সরকার জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব, অন্যদিকে বিপিসির লোকসান ও আমদানি ব্যয়—দুই দিক সামলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।












