ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। বুধবার (৭ অক্টোবর) ভোরে চালানো এসব হামলায় অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচ শিশু রয়েছে। হামলায় আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ।
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি হয়েছে চেরনিহিভ প্রদেশের প্রিলুকি জেলায়। সেখানে একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রাণ হারায় শিশুসহ বহু মানুষ।
শক্তিশালী বিস্ফোরণে পাঁচতলা ভবনটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। ভবনের জানালার কাচ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। ভবনের একটি বড় অংশ পুড়ে যাওয়া কংক্রিট, ধ্বংসাবশেষ ও দুমড়েমুচড়ে যাওয়া ধাতব কাঠামোর স্তূপে পরিণত হয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, নিহত শিশুদের মধ্যে তিনজনের বয়স মাত্র ১২ মাস এবং আরেকজনের বয়স ছিল আট বছর। পরে সন্ধ্যায় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আরও এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, শুধু প্রিলুকির ওই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে হামলাতেই ২০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। আহতদের মধ্যে অন্তত সাত শিশু রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কি।
রুশ বাহিনীর এই হামলাকে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক শহর ও সাধারণ মানুষের জীবনকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ করেছেন।
জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের জনগণ ও শিশুদের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের অব্যাহত ব্যবহার সন্ত্রাস সৃষ্টির একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ।
তবে হামলার বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি, যেখানে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ স্বীকার করা হয়েছে।
প্রিলুকির ৪০ বছর বয়সী বাসিন্দা ও ম্যাসাজ থেরাপিস্ট ওলেনা সায়ুন হামলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, হামলার সময় তারা বাড়িতে ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ শক্তিশালী বিস্ফোরণে তাদের ঘরের জানালার কাচ উড়ে যায়।
সায়ুন বলেন, তারা নিজেদের শরীর দিয়ে সন্তানকে আড়াল করেছিলেন। এতে তাঁর ও তাঁর স্বামীর শরীরে কেটে যাওয়ার মতো আঘাত লাগে। হামলার সময় সন্তানটি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
পরিবারটি দ্রুত বাথরুমে আশ্রয় নেয়। তখন তাদের অ্যাপার্টমেন্টের বিভিন্ন জিনিসপত্র বিস্ফোরণের ধাক্কায় ছিটকে পড়ে এবং ভবনের ভেতরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৬টার দিকে প্রিলুকিতে হামলা শুরু হয়। এর আগের দিনই জেলেনস্কি রাশিয়ার সম্ভাব্য একটি ‘ব্যাপক’ হামলা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
শীতকাল ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনে রুশ বিমান হামলা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় নিয়মিত বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজছে।
নিরাপত্তার জন্য অনেক বাসিন্দা রাত কাটাতে মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নিচ্ছেন। কেউ কেউ ব্যাগ, কম্বল ও শোয়ার মাদুর সঙ্গে নিয়ে ভূগর্ভস্থ স্টেশনগুলোতে অবস্থান করছেন।
ব্যাংক কর্মকর্তা ইরিনা রিবালচেঙ্কো জানান, তারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, পুরো কিয়েভ শহরেই এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে। কর্মস্থলে থাকাকালীনও সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সবাইকে সতর্ক থাকার বার্তা পাঠাচ্ছিলেন।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর দাবি, বুধবার রুশ বাহিনী দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক, কিয়েভ, খারকিভ ও পোলতাভাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৩০টি ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে।
জেলেনস্কি এ হামলাকে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অন্যতম ভয়াবহ হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করতে নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
অন্যদিকে, প্রিলুকিতে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের কাছাকাছি বসবাসকারী ৩১ বছর বয়সী অনলাইন বিপণনকর্মী ইউলিয়া শামরাই প্রশ্ন তুলেছেন, আবাসিক এলাকায় এমন হামলা চালিয়ে রাশিয়া কী সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে বেসামরিক এলাকায় নতুন করে বড় ধরনের প্রাণহানি সংঘাতের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যু এবং আবাসিক ভবন ধ্বংসের ঘটনায় ইউক্রেনজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।












