ইরাকের ভূখণ্ডে বর্তমানে কোনো মার্কিন সেনাসদস্য অবশিষ্ট নেই বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলি ফালিহ আল-জাইদি। একই সঙ্গে আগামী ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে দেশের সব অস্ত্র রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাগদাদ। দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে থাকা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্যোগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব বজায় রাখার কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) প্রকাশিত তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ইরাকি নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-জাইদি বলেন, বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি শেষ হওয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র ধরে রাখার পক্ষে আগে যে যুক্তি দেওয়া হতো, তা আর গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর সরকারের লক্ষ্য হলো, দেশের সব অস্ত্র ও নিরাপত্তা কার্যক্রমকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে কোনো অস্ত্র থাকবে না—এমন লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে তিনটি প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। আরও চারটি গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা চলছে। তাঁর বক্তব্য, রাষ্ট্রের ওপর কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব থাকতে পারে না; বরং সব গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় আইন ও কর্তৃত্বের অধীনে পরিচালিত হতে হবে।
ইরাকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব দেশটির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এসব গোষ্ঠীর অস্ত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার সম্পন্ন হলেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন আল-জাইদি। তাঁর মতে, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা ইরাকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে মার্কিন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ শুরু করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাগদাদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী, ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন শেষ করার প্রক্রিয়া নির্ধারিত হয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাক আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন সমাপ্তির ঘোষণা দেয়। এর পরবর্তী পর্যায়ে সামরিক উপস্থিতির পরিবর্তে নিরাপত্তা সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মতো কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে ইরাক কোনো সামরিক সংঘাতে জড়াবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী আল-জাইদি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক সংকটের সমাধান আলোচনার মাধ্যমে খুঁজে বের করা প্রয়োজন। ইরাক বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংলাপের সুযোগ তৈরি করতে চায়।
প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করার সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন তিনি। আল-জাইদির মতে, ইরানের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করা হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ইরাক নিজেও বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়বে। ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখাকে গুরুত্ব দিচ্ছে বাগদাদ।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকট ও নৌপথে চলাচলের অনিশ্চয়তার কারণে তেল রপ্তানির বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে ইরাক। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, তুরস্কের জেহান বন্দরের মাধ্যমে পুনরায় তেল রপ্তানি চালু করা এবং বিকল্প রপ্তানি পথ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
ইরাকের অর্থনীতির বড় অংশ তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা দেখা দিলে দেশটির রপ্তানি আয় ও জ্বালানি খাতের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিকল্প পাইপলাইন ও রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে এই নির্ভরতা কমানোই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
আল-জাইদি আরও জানিয়েছেন, ২০৩২ সালের মধ্যে ইরাকের দৈনিক তেল উৎপাদন সক্ষমতা এক কোটি ব্যারেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায় ইরাক। এ লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘ডেভেলপমেন্ট রোড’ প্রকল্পকে দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরগুলোকে সড়ক ও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে তুরস্ক এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পণ্য পরিবহন, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পের অগ্রগতি নির্ভর করবে অর্থায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর।
সব মিলিয়ে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য—দেশের অভ্যন্তরে অস্ত্রের ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠা। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমঝোতা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তেল রপ্তানির বিকল্প পথ তৈরি করতে পারলে দেশটির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় নতুন গতি আসতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির ওপর।