বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আকাশে উড়তে পারাটাই ছিল মানুষের কাছে এক বিস্ময়। তখন বিমান চালানো যেমন ছিল দুঃসাহসিক কাজ, তেমনি নিরাপদে বিমান মাটিতে নামিয়ে আনাও ছিল পাইলটদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেই সময়ই আকাশে নানা কসরত দেখিয়ে দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার প্রচলন শুরু হয়। পরে উড়ন্ত বিমানের ডানায় হাঁটা, এক বিমান থেকে অন্য বিমানে চলে যাওয়া এবং আকাশে বিপজ্জনক কৌশল প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘ফ্লাইং সার্কাস’ ও ‘উইং ওয়াকিং’।
ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান অ্যারোসুপারব্যাটিকসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইতিহাসবিষয়ক একটি নিবন্ধে এসব দুঃসাহসিক প্রদর্শনীর বিকাশের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিমান নির্মাণ প্রযুক্তি এবং পাইলটদের দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। যুদ্ধ শেষে বিপুলসংখ্যক সামরিক বিমান অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। তুলনামূলক কম দামে এসব বিমান কেনার সুযোগ কাজে লাগান একদল তরুণ বৈমানিক ও দুঃসাহসী উদ্যোক্তা। তাঁরা সাধারণ মানুষের সামনে আকাশে নানা ধরনের কসরত দেখিয়ে অর্থ উপার্জনের পথ খুঁজে নেন। এভাবেই বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে আকাশে উড্ডয়ন ও কসরত প্রদর্শনকারী দল, যা পরিচিতি পায় ‘ফ্লাইং সার্কাস’ নামে।
এসব প্রদর্শনীতে দর্শকদের জন্য থাকত নানা রকম আকর্ষণ। কয়েক শিলিং বা ডলারের বিনিময়ে কেউ কেউ বিমানে চড়ার সুযোগ পেতেন। অন্যদিকে পাইলটেরা আকাশে লুপ, রোল, উল্টো হয়ে ওড়া এবং দ্রুত দিক পরিবর্তনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল দেখাতেন। দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রদর্শনীগুলোতে যুক্ত হতে থাকে আরও বিপজ্জনক ও ব্যতিক্রমী কসরত।
এই ফ্লাইং সার্কাসের সবচেয়ে আলোচিত আকর্ষণগুলোর একটি ছিল উইং ওয়াকিং। এ কৌশলে পাইলট বা প্রশিক্ষিত পারফরমার উড়ন্ত বিমানের ককপিট থেকে বেরিয়ে ডানার ওপর হাঁটতেন কিংবা দাঁড়িয়ে বিভিন্ন কসরত দেখাতেন। কখনো কখনো এক বিমান থেকে অন্য বিমানে যাওয়ার মতো রোমহর্ষক প্রদর্শনীও করতেন তাঁরা। নিচে বিস্তীর্ণ আকাশ আর প্রবল বাতাসের মধ্যে এমন কসরত দর্শকদের কাছে ছিল একই সঙ্গে বিস্ময়কর ও আতঙ্কের।
১৯১৮ সালে মার্কিন বৈমানিক অর্মার লকলিয়ার উড়ন্ত বিমানের ডানায় হাঁটার কৌশল দেখিয়ে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন বলে ইতিহাসবিষয়ক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিমানের কারিগরি সমস্যা মোকাবিলা করতে গিয়ে ককপিটের বাইরে বের হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এই কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন বলে জানা যায়। পরে সেই অভিজ্ঞতাকে দর্শকদের সামনে দুঃসাহসিক প্রদর্শনী হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
লকলিয়ারের মতো আরও অনেকেই উইং ওয়াকিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইথেল ডেয়ার্স, যিনি বিশ্বের প্রথম নারী উইং ওয়াকারদের একজন হিসেবে পরিচিত। তিনি উড়ন্ত বিমানের ডানায় হাঁটার পাশাপাশি এক বিমান থেকে অন্য বিমানে যাওয়ার মতো বিপজ্জনক কসরতও দেখাতেন। এসব প্রদর্শনীতে নারী-পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণ তৎকালীন দর্শকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
তবে এই দুঃসাহসিক বিনোদনের পেছনে ছিল ভয়াবহ ঝুঁকি। শুরুর দিকে উইং ওয়াকারদের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের শরীরে প্যারাস্যুট থাকত না, এমনকি বিমানের সঙ্গে আটকে রাখার জন্য নিরাপত্তা তারও ব্যবহার করা হতো না। ফলে সামান্য ভারসাম্য হারানো কিংবা হঠাৎ বাতাসের ধাক্কায় পড়ে যাওয়ার অর্থ হতে পারত নিশ্চিত মৃত্যু।
এ ধরনের ঝুঁকি থেকে রেহাই পাননি অর্মার লকলিয়ারও। একটি চলচ্চিত্রের কাজে অংশ নেওয়ার সময় বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর মতো দুঃসাহসী প্রদর্শকদের জীবন ও দুর্ঘটনা উইং ওয়াকিংয়ের বিপজ্জনক দিকটিও সামনে নিয়ে আসে।
পরবর্তী সময়ে এ ধরনের প্রদর্শনীতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নজর বাড়ে। ১৯৩৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে উইং ওয়াকারদের জন্য প্যারাস্যুট পরা বাধ্যতামূলক করা হয় বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তত দিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিমান চলাচলের অগ্রাধিকার বদলে যাওয়ায় ফ্লাইং সার্কাসের স্বর্ণযুগও ধীরে ধীরে শেষ হতে থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিমান প্রযুক্তির বিকাশ নতুন দিকে মোড় নেয়। দ্রুতগতির বিমান, শব্দের গতিসীমা অতিক্রম, মহাকাশ অনুসন্ধান এবং আরামদায়ক যাত্রীবিমান তৈরির ওপর গুরুত্ব বাড়ে। বিমান ভ্রমণও ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালে আসতে শুরু করে। ফলে আগের মতো ফ্লাইং সার্কাসের প্রদর্শনী আর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেনি।
তবে উইং ওয়াকিংয়ের ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বিমান চলাচলের ইতিহাস ও পুরোনো দিনের দুঃসাহসিক প্রদর্শনী ধরে রাখতে আগ্রহী কিছু দল এ ধরনের কসরত চালু রাখে। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে আবারও কয়েকটি দল উইং ওয়াকিং প্রদর্শনী শুরু করে। পরে ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে ভিক নরম্যানের প্রতিষ্ঠিত অ্যারোসুপারব্যাটিকস দল ইউরোপে এই প্রদর্শনীকে নতুন করে পরিচিত করে তোলে।
বর্তমানে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা বোয়িং স্টিয়ারম্যান বাইপ্লেনসহ বিভিন্ন বিমানে উইং ওয়াকিং প্রদর্শনী করা হয়। আধুনিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারীদের শরীরের সঙ্গে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্ত করা হয়, যা অতীতের তুলনায় ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। তবু প্রবল বাতাস, বিমানের কম্পন, উচ্চতা এবং উড়ন্ত অবস্থায় শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ এই কসরতকে এখনো অত্যন্ত কঠিন করে রেখেছে।
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিমান চলাচল অনেক বেশি নিরাপদ ও সহজ হয়েছে। কিন্তু একসময় মানুষের সাহস, দক্ষতা এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা ফ্লাইং সার্কাস আজও বিমান চলাচলের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। উড়ন্ত বিমানের ডানায় হাঁটার সেই দুঃসাহসিক প্রদর্শনী প্রমাণ করে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগের অনেক আগেই মানুষ আকাশকে শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বিস্ময়কর বিনোদনের মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহার করেছিল।