কুমিল্লায় হত্যাকাণ্ডের শিকার ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তার মা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির একটি প্রতিনিধি দল কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকায় অপ্রতিমের বাসায় গিয়ে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানায়। এ সময় আইনজীবীদের কাছে নিজের ছেলেকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভিন্ন বক্তব্যের বিষয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাহিদা বেগম।
নাহিদা বেগম বলেন, বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে তার ছেলেকে নানা উপায়ে দায়ী বা অপরাধী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, তার ১৩ বছর বয়সী সন্তান কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না এবং তাকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা তিনি মেনে নেবেন না।
নিজের অতীত প্রশাসনিক দায়িত্বের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদা বেগম বলেন, ২০২৫ সালের শুরুতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি কয়েকজন মাদকসেবী ও মাদক কারবারিকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ওই ঘটনার কারণে তার ছেলেকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকলে সেটিও তিনি মেনে নেবেন না বলে জানান।
শোকার্ত এই মা বলেন, তার কোনো অপরাধ থাকলে তার জন্য তাকেই শাস্তি দেওয়া হোক। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যদি তার অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে সেই শাস্তি তিনি পেতে প্রস্তুত। কিন্তু তার সন্তানের কেন সেই শাস্তি ভোগ করতে হবে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
অপ্রতিমকে মাদক কারবারিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তার মা। তিনি বলেন, তার ছেলে ছোট শিশু এবং এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সে কিছুই বুঝত না। এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
নাহিদা বেগম আরও বলেন, তিনি শুধু নিজের সন্তানের হত্যার বিচার চান না; হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা ভবিষ্যতে মুক্ত হয়ে অন্য শিশুদের জীবন বিপন্ন করতে পারে—এ নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন। তাই প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এদিকে অপ্রতিম হত্যা মামলায় পুলিশের তদন্তে এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এছাড়া ২১ সেপ্টেম্বর আরও একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, তদন্তে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গেছে। অপ্রতিমের মরদেহ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন সালমানপুর এলাকার একটি স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। মামলার তদন্তে একটি আইফোন উদ্ধারের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
অপ্রতিমের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু, সরকারি আইন কর্মকর্তা (জিপি) অ্যাডভোকেট তারেক আবদুল্লাহ, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শহীদ উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহাবুবুল হক খন্দকার এবং সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শরীফুল ইসলামসহ জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
আইনজীবীরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের বিষয়ে আশ্বাস দেন। এর আগে একই প্রতিনিধি দল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গেও অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বৈঠক করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রতিমকে নিয়ে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়লেও সেগুলোর সত্যতা যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ছড়ানো বিভিন্ন দাবির সত্যতা তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।












