ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবারও জয় পেয়েছেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের মতো দেশটির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ নিশ্চিত করেছেন তিনি। লুলার এই জয় শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার ভোট গণনা শেষে ব্রাজিলের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ লুলাকে বিজয়ী ঘোষণা করে। চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, তিনি বৈধ ভোটের ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ পেয়েছেন। অন্যদিকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান ৪৪ লাখের বেশি ভোট। ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি লুলার নতুন মেয়াদ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। <Cite refs={[“turn899129search20″,”turn899129news36″,”turn899129search26”]}/>
২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন লুলা। এরপর ২০২৩ সালে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন তিনি। এবারের জয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর চতুর্থ প্রেসিডেন্ট মেয়াদ নিশ্চিত হলো। রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতন পেরিয়ে আবারও নির্বাচিত হওয়াকে তাঁর বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লুলা দা সিলভা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বামপন্থী ও প্রগতিশীল ধারার অন্যতম পরিচিত নেতা। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্রাজিলের স্বাধীন অবস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছেন। ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাঁর অবস্থান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির সমালোচনাও তাঁকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে লুলা দা সিলভা গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছেন এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা এবং শিশুদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরেছেন। তাঁর এই অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফিলিস্তিনের অধিকার ও মানবিক সংকট নিয়ে সোচ্চার নেতাদের মধ্যে তাঁকে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রেখেছে।
লুলার রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রমিক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ধাতুশিল্পের শ্রমিক ছিলেন এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র্য হ্রাস, ক্ষুধা মোকাবিলা ও সামাজিক নিরাপত্তা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ কারণে লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বামপন্থী রাজনীতিক ও শ্রমিক অধিকারকর্মীদের কাছে লুলা একটি পরিচিত নাম। তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, সামাজিক বৈষম্য কমানো ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার সমালোচনা করেছেন লুলা। ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব ও নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিরোধিতা করে আসছেন।
এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধারার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ফলে নির্বাচনের ফলাফলকে অনেক পর্যবেক্ষক ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের পাশাপাশি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গেও মিলিয়ে দেখছেন।
লুলার পুনর্নির্বাচন লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। তাঁর সমর্থকেরা এই ফলকে গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেশটির রাজনৈতিক মেরুকরণের চিত্রও তুলে ধরেছে।
সব মিলিয়ে লুলার এই জয় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আগামী মেয়াদে অর্থনীতি, সামাজিক বৈষম্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন মোকাবিলায় তাঁর সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।