ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ভোটগ্রহণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরেও ক্যামেরা সংযুক্ত থাকবে। নির্বাচনে সহিংসতা, অনিয়ম কিংবা আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে তা শনাক্ত ও পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এসব ক্যামেরার ধারণ করা দৃশ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিইসি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে কাউকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করতে কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সিইসি জানান, ভোটকেন্দ্র, ভোটার তালিকা, নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং ভোটগ্রহণের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার কাজ এগিয়ে চলছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের জন্য ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনগতভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ এবং আদালতের নির্দেশনার আওতায় থাকা ইউনিয়ন পরিষদগুলো বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ধাপে প্রায় ৮০০ থেকে এক হাজার ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণ হতে পারে বলে জানান তিনি।
ইউপি নির্বাচনে সহিংসতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা বেশি দেখা গেছে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হবে। পাশাপাশি আচরণবিধি বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে, যাতে প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করতে না পারেন।
নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার প্রস্তুতিও অব্যাহত রয়েছে বলে জানান সিইসি। তাঁর মতে, শুধু ভোটগ্রহণের আয়োজন করাই নয়, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করাও কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে দায়িত্ব নেওয়ার পর কমিশন দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে।
সিইসির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া সম্পর্কে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নির্বাচন কমিশনকে একটি আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদের কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রায় ৭৭ হাজার কর্মী নিয়োগ ও তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই কার্যক্রমে প্রায় ১০ লাখ নারী ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ২১ লাখের বেশি মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানান সিইসি।
নির্বাচন কমিশনের মতে, নির্ভুল ভোটার তালিকা, ভোটকেন্দ্রে নজরদারি, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রস্তুতি এবং আচরণবিধির কার্যকর প্রয়োগ—এসব উদ্যোগ সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন, অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর।
ইউপি নির্বাচনে সিসি ক্যামেরা ও শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং জবাবদিহি বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নির্বাচনে সহিংসতা ও অনিয়ম প্রতিরোধে প্রযুক্তির পাশাপাশি নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনগণের আস্থা অর্জনের বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করবে।