ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। গত জুলাইয়ে দেওয়া হিসাবের তুলনায় এই ব্যয় ২৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের একটি সর্বশেষ হিসাবের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে নতুন হিসাবটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি পেন্টাগন।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য গোলাবারুদ ব্যবহার এবং সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি। পেন্টাগনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলাবারুদ পুনরায় মজুত করতেই ২৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জাম, উড়োজাহাজ ও ড্রোনের ক্ষতি পূরণে আরও ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ প্রয়োজন হতে পারে।
এর আগে গত জুলাইয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছিলেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। নতুন হিসাব অনুযায়ী, কয়েক মাসের ব্যবধানে এই ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। তবে পেন্টাগনের হিসাবের মধ্যে যুদ্ধ পরিচালনার বিভিন্ন খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো মেরামতের সম্পূর্ণ ব্যয় স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে যুদ্ধের প্রকৃত আর্থিক বোঝা আরও বাড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল করতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যয়বহুল ও অত্যাধুনিক নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল। পরবর্তী সময়ে তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে এপ্রিলে যুদ্ধবিরতির সুযোগে ইরান ভূগর্ভস্থ অস্ত্রের মজুত ও সামরিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কিছু অংশ আবার সক্রিয় করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সামরিক অভিযান পরিচালনার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা জটিল হয়ে পড়ে।
এদিকে ইরানের তেল রপ্তানি থেকে আয় সীমিত করতে দেশটির ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নির্দেশ দেওয়া হলে নতুন করে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। তবে অভিযান পুনরায় শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। আগামী ৩ নভেম্বর দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হবে। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং সংঘাত নিয়ে জনমতের চাপ রিপাবলিকান দলের প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা সামান্য ব্যবধানে রয়েছে।
যুদ্ধের আর্থিক চাপ শুধু অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক অভিযান পরিচালনা, উড়োজাহাজের কার্যক্রম, যোগাযোগ ও সাইবার সহায়তাসহ বিভিন্ন খাতেও ব্যয় হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি মেরামত এবং হারানো সামরিক সরঞ্জাম পুনরায় সংগ্রহের ব্যয় যুক্ত হলে মোট খরচ আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেটের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে। পেন্টাগনের সর্বশেষ হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত না হওয়ায় ব্যয়ের চূড়ান্ত পরিমাণ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সামরিক ব্যয় এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওপর এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
সূত্র: রয়টার্স।