বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ার নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের পর সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট অবস্থান জানানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার ক্রসফায়ার সমর্থন করে না; বরং এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের একটি বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
ক্রসফায়ার বলতে সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সংঘর্ষের সময় নিহত হওয়ার ঘটনাকে বোঝানো হলেও বাংলাদেশে শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত করেছে। তাই অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকিরের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এ বিতর্কের সূত্রপাত হয়। গত সোমবার পুরান ঢাকার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজন হলে পুলিশ ক্রসফায়ার করবে। তাঁর এ বক্তব্যের পর বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়। মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বক্তব্যের ব্যাখ্যা, জবাবদিহি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান জানানোর দাবি ওঠে।
পরবর্তী সময়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এক ব্যাখ্যায় বলা হয়, আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অর্থে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। পুলিশ সদর দপ্তরের দাবি, মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার বোঝাতে গিয়ে তিনি শব্দটি ব্যবহার করেছেন। পুলিশের দায়িত্ব পালনের সময় সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধী গ্রেপ্তার ও সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় চারজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। পুলিশ সদস্যদের আত্মরক্ষার অধিকার প্রচলিত আইনে স্বীকৃত হলেও সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনগত সীমা ও প্রয়োজনীয়তার শর্ত মানা জরুরি।
আইজিপির বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধ দমনে পেশাদার তদন্ত, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করার বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেছেন, সরকারের অনুমতি থাকলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বৈধ হয়ে যায় না। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাতিল করা যায় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আইজিপির বক্তব্যকে সরকারের জন্য বিব্রতকর বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিএনপি দীর্ঘদিন গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। সেই দলের সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ে পুলিশপ্রধানের মুখে ক্রসফায়ারের কথা আসা উদ্বেগের বিষয়। তাঁর মতে, সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে দেশে প্রচলিত আইন রয়েছে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব সেই আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা।
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, সরকার ক্রসফায়ার চায় না এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান জিরো টলারেন্স। আইজিপি অসতর্কতাবশত এমন কথা বলেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বক্তব্যটি ঠিক হয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও সরকার সহ্য করবে না বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দেশে অপরাধ, চাঁদাবাজি ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ থাকলেও তার সমাধান বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হতে পারে না। অপরাধের অভিযোগের তদন্ত, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ, অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা এবং বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা কার্যকর হওয়া উচিত। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ক্রসফায়ার নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কে সরকারের বক্তব্যের তাৎপর্য তাই শুধু একটি শব্দের ব্যবহার প্রত্যাখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ, হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপই হবে সরকারের ঘোষিত অবস্থানের কার্যকারিতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।