দেশের ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দলীয় প্রভাব ও সুবিধা বিতরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে ঋণখেলাপির সংস্কৃতি, অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ এবং ব্যাংক লুটপাটের কারণে দেশের আর্থিক খাত গভীর সংকটে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কার্যকর সংস্কার, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং পেশাগত নৈতিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বুধবার সকালে রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) আয়োজনে ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন ২০২৬-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যাংকিং খাতের অতীত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ঋণখেলাপির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নিয়মকানুন ও সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে কিছু বেসরকারি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি নেওয়াও সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্যাংক থেকে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ বের করে নেওয়ার প্রবণতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তাঁর মতে, যথাযথ নিয়মকানুন ও জবাবদিহি ছাড়া ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হলে পুরো অর্থনীতিই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোতে হবে। অতীতে যথাযথ নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো তৈরি না করেই বেসরকারি খাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়ার পরিণতি ভালো হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে উদ্যোক্তা পরিচালকেরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে আমানতের প্রায় ৩৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে তুলে নিয়েছিলেন। এ ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে ব্যাংকের মালিকানা, ঋণ বিতরণ ও পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন।
ব্যাংকিং খাতে পরিবারতান্ত্রিক আধিপত্য ও একক গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, একটি পরিবার বা গোষ্ঠী একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে কি না, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন থাকা দরকার ছিল। এ ধরনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিরোধে প্রতিযোগিতাবিরোধী আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
২০১০ সালের পর রাজনৈতিক বিবেচনায় পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই একের পর এক ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার সমালোচনা করে ড. মাহমুদ বলেন, অপরিকল্পিতভাবে অনুমোদন পাওয়া কিছু দুর্বল ও দেউলিয়া ব্যাংকে সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক এবং নিম্নবিত্ত কর্মচারীদের কল্যাণ ও পেনশন তহবিলের বিপুল অর্থ আটকে রয়েছে। এসব অর্থ ফেরত না পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আমানতকারীরা আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোকে বছরের পর বছর রাজনৈতিক সুবিধা বিতরণের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে কোনো গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন হলে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর নয়—এমন বিকল্প ব্যবস্থা বেছে নেওয়া উচিত। ব্যাংকিং খাতের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য আত্মঘাতী হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতে, আর্থিক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সাধারণ ব্যাংকারদের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংকিং খাতের বিধিবিধান অতিরিক্ত শিথিল করার পরিণতিতে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে কিছু ক্ষেত্রে নিয়মকানুনে পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে অতীতে শিথিলতার কারণে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, একই ধরনের সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি হলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সংকট উত্তরণে ব্যাংকগুলোকে নিজেদের সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, প্রতিটি ব্যাংক ও ঋণপ্রস্তাব আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে প্রকৃত উদ্যোক্তা ও সৎ ব্যবসায়ীরা অর্থায়ন পান। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ বিতরণ করা হলে অতীতের অনিয়ম আবারও ফিরে আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কেবল কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করলেই ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা যায় না। ব্যাংকের উদ্যোক্তা, পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মকর্তাদের পেশাগত সততা এবং নৈতিক দায়িত্ববোধও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহম্মদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আবদুল হাই সরকার এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন।
ব্যাংকিং সম্মেলনে আলোচকেরা দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, সুশাসন, জবাবদিহি এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন।